আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠ প্রশাসনের এক শ্রেণির কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে অবসরপ্রাপ্ত বিসিএস অফিসার্স ফোরাম। ফোরামের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবারের নির্বাচন প্রশাসনের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। যদি প্রশাসন এই নির্বাচনে নিরপেক্ষতা প্রমাণে ব্যর্থ হয়, তবে ভবিষ্যতে নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের নৈতিক দাবি তারা হারাবে।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। প্রার্থিতা বাছাইয়ে কতিপয় রিটার্নিং কর্মকর্তার প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিতের দাবিতে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সাবেক সচিব মোহাম্মদ কাইয়ুম বলেন, “বিগত তিনটি ব্যর্থ ও জালিয়াতির নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে আসন্ন নির্বাচন জাতির জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজনের ওপর গণতন্ত্রে উত্তরন ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ নির্ভর করছে। গত তিনটি নির্বাচন ব্যর্থ হওয়ার জন্য সাথে শাসক শ্রেণীর সাথে সাথে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গ প্রতিষ্ঠান, নির্বাচন কমিশন এবং সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদেরকে যথার্থ কারণে দায়ী করা হয়।”
তিনি আরও বলেন, “আগামী নির্বাচন নিরপেক্ষ করতে হলে সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের আবশ্যিকভাবে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রশাসন, কর্মকর্তা তথা বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণ যথাক্রমে রিটার্নি ও সহকারী রিটানিং অফিসার হিসেবে যে দায়িত্ব পালন করবেন সেই দায়িত্ব অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে পালন করতে হবে।
দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে দায়িত্ব পালনের জন্য পরীক্ষা ওও সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমি মনে করি,২০২৬ সালের নির্বাচন প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ও সুযোগ। পরীক্ষা এজন্য যে, জাতীয় স্বার্থে এ নির্বাচন কে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে হবে আর সুযোগ এজন্য যে, এবারের নির্বাচনে যদি প্রশাসন ক্যাডার ব্যর্থ হয় তাহলে ভবিষ্যতে রিটার্নিং বা সহকারি রিটার্নিং অফিসার হওয়ার দাবী শক্তিশালী থাকবে না। তাই আমরা আমাদের পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ দিয়ে মাঠ প্রশাসন,সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ ও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় এবং নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে চাই।”
তিনি আরও বলেন, “বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) অত্যন্ত কঠোরভাবে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে।”
সংবাদ সম্মেলনে সমাপনী বক্তব্যে সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ শরিফুল আলম নির্বাচন কমিশন ও সরকারের নিকট ৭ দফা দাবি তুলে ধরেন-
১. নির্বাচনের সাথে জড়িত যেসব কর্মকর্তা বিশেষত: রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে তাদেরকে অনতিবিলম্বে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে হবে।
২. নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনী আইন প্রয়োগে পক্ষপাতহীন ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনে কঠোর হতে হবে।
৩. প্রতিটা ভোটকেন্দ্রে কারচুপি রোধে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগাতে হবে।
৪. নির্বাচন কমিশন সহ নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিতে প্রয়োজনে স্বতন্ত্র যত দ্রুত সম্ভব গাইডলাইন প্রকাশ করতে হবে।
৫. নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কারো বিরুদ্ধে কোন ধরনের অভিযোগ উত্থাপন হলে তদন্ত সাপেক্ষে সাথে সাথে তাকে তার কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করতে হবে এবং পরবর্তীতে এসব তার কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রমোশনের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনে চাকরিচ্যুত করতে হবে।
৬. নির্বাচন কমিশন কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচন অফিস, বিভাগীয় কমিশনার অফিস,জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অভিযোগ বক্স রাখার ব্যবস্থা করতে হবে এবং দুই/তিন দিন পরপর এ বিষয়ে ব্রিফিং করবে।
৭. নির্বাচনকালে যারা জেলা প্রশাসক,উপজেলা নির্বাহী অফিসার,থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তাদেরকে নির্বাচন সমাপ্ত হবার এক সপ্তাহের মধ্যে লটারির মাধ্যমে অন্য কর্মস্থলে আবশ্যিকভাবে বদলি করতে হবে এজন্য মন্ত্রী পরিষদ বিভাগকে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সাবেক আমলারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তারা মাঠ প্রশাসন, জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতেই এই পর্যবেক্ষণ ও দাবি পেশ করছেন। সংবাদ সম্মেলনে ফোরামের অন্যান্য সদস্য ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সাবেক আমলাদের এই অবস্থান একটি অংশগ্রহণমূলক ও ভয়হীন নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তাকেই তুলে ধরেছে। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি ও নজরদারির যে কঠোর প্রস্তাব তারা দিয়েছেন, তা কার্যকর হলে ভোটের মাঠে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কমে আসবে।









