মেহেরপুরে সরষের হলুদ ফুলে ডানা মেলেছে কৃষকের স্বপ্ন: বাম্পার ফলনের হাতছানি

মাঠে নামলেই মনে হয় যেন সূর্যোদয়ের আগেই হাজারো ছোট সূর্য ফুটে আছে। মেহেরপুরের পথে-প্রান্তরে সরিষা ফুলের মনোরম সমারোহে এখন চোখ জুড়িয়ে যায়। দিগন্তজোড়া মাঠজুড়ে হলুদের এই চাদর শুধু প্রকৃতিকে সাজায়নি, বুনেছে হাজারো কৃষকের স্বপ্ন। অনুকূল আবহাওয়া আর স্বল্প খরচে লাভজনক হওয়ায় এবার মেহেরপুরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে সরিষার চাষ হয়েছে।

লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে সরিষার আবাদ
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে মেহেরপুর জেলায় সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৮৫০ হেক্টর। তবে মাঠের বাস্তবতা কৃষি বিভাগের হিসাবকেও ছাড়িয়ে গেছে। এবার জেলায় ৪ হাজার ৯৫ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, বাজারে ভোজ্য তেলের দাম বেশি হওয়া এবং আমন ধান কাটার পর জমি ফেলে না রেখে কৃষকরা সরিষা চাষে ঝুঁকছেন।

লাভের অংকে কৃষকের হাসি
মেহেরপুর সদর উপজেলার উজলপুর গ্রামের সরিষা চাষী আবু হোসেন জানান, প্রতি বিঘা জমিতে সরিষা চাষে খরচ হয় মাত্র ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। তিন মাসের এই ফসলে তেমন সেচের প্রয়োজন হয় না। প্রতি বিঘা জমিতে ৭ থেকে ৮ মণ সরিষা পাওয়া যায়। গত বছর প্রতি মণ সরিষা ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। সেই হিসাবে খরচ বাদে প্রতি বিঘা থেকে প্রায় ১৫ হাজার টাকা লাভ করা সম্ভব।

তিনি আরও জানান, সরিষার বড় শত্রু ‘জাব পোকা’। তবে এবার জাব পোকার আক্রমণ না থাকায় ফলন আরও ভালো হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

বহুমুখী ব্যবহার ও উপকারিতা
সরিষা শুধু তেলের চাহিদা মেটায় না, এর রয়েছে বহুমুখী গুণ। সরিষার তেলের ওষধি গুণ যেমন সমাদৃত, তেমনি সরিষার খৈল জমির উর্বরতা বাড়ায়। সরিষার শুকনো গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেন গ্রামবাসী। এছাড়াও সরিষার পাতা পচে জমিতে প্রাকৃতিক সার তৈরি হয়, যা পরবর্তী ফসলের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

মৌমাছির গুঞ্জনে মুখর মাঠ
সরেজমিনে বিভিন্ন গ্রামের মাঠ ঘুরে দেখা যায়, হলুদ সায়রের ওপর দিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে মৌমাছির দল। সরিষার ডাঁটায় বসে তারা মধু সংগ্রহ করছে। মৌমাছির এই গুঞ্জন আর বাতাসের হিল্লোলে দুলতে থাকা হলুদ ফুলগুলো যেন কৃষকের সোনালি ভবিষ্যতের বার্তা দিচ্ছে।

কৃষি বিভাগের আশাবাদ
মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সনজীব মৃধা জানান, রবিশস্য চাষের জন্য এবার আবহাওয়া অত্যন্ত অনুকূল। তিনি বলেন, “কৃষকরা এখন অনেক সচেতন। আমন সংগ্রহের পর বাড়তি ফসল হিসেবে সরিষা চাষ করে তারা লাভবান হচ্ছেন। আবহাওয়া শেষ পর্যন্ত এমন থাকলে এবার জেলায় সরিষার বাম্পার ফলন হবে।”

শীতের এই হলুদ উৎসব মেহেরপুরের গ্রামবাংলার অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবার লাভের ফসল ঘরে তুলবেন মেহেরপুরের পরিশ্রমী কৃষকরা।