দরজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের লুট হওয়ার প্রায় সাড়ে ১৬ মাস পার হয়ে গেলেও একটা উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। লুট হওয়ার এক বছর পর গত ১০ আগস্ট অস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কার ঘোষণা করেও তেমন লাভ হয়নি। উল্টো আন্ডারওয়ার্ল্ডে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ছড়াছড়ি বাড়ছে। তবে এসব অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র রয়েছে কি না, তা কেউ নিশ্চিত করতে পারেনি। এদিকে অস্ত্রগুলো উদ্ধার না হওয়ায় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, সাধারণ মানুষ ও প্রার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ততই বাড়ছে। পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্রগুলো এখন কাদের হাতে এ প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকগণ বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিপুল সংখ্যক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দেশকে নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে। এর ফলে সহিংসতা, রাজনৈতিক ভীতিপ্রদর্শন এবং অপরাধ সংঘটনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর মতিঝিলে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও জাতীয় নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার পর সারা দেশে আন্ডারওয়ার্ল্ডে অবৈধ অস্ত্রের মজুত নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে ভাবিয়ে তুলেছে। এই ঘটনার ১০ দিনের মাথায় গত ২২ ডিসেম্বর খুলনার সোনাডাঙায় একটি বাড়িতে দলীয় অন্তঃকোন্দলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) খুলনা বিভাগীয় প্রধান ও জাতীয় শ্রমিক শক্তির কেন্দ্রীয় সংগঠক মোতালেব শিকদার গুলিবিদ্ধ হন। এর পাশাপাশি যশোর, চট্টগ্রাম, খুলনা, গাজীপুর, নারায়াণগঞ্জ, কুমিল্লা, বগুড়া, পাবনাসহ ২০ জেলায় গত ১৪ মাসে প্রতিপক্ষের অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে পাঁচ শতাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশের লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রগুলো অপরাধের জন্য ব্যবহার করা হয়। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপরাধীদের আগ্নেয়াস্ত্র ভাড়া দেওয়ারও ঘটনা ধরা পড়েছে। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন যাতে অনুষ্ঠিত হতে না পারে সেজন্য অপরাধীগোষ্ঠী অিস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির জন্য এসব আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র বলছে, আন্ডারওয়ার্ল্ডে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের পাশাপাশি পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্রও যুক্ত হয়েছে। এটাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলেছে। এ কারণে গত ১০ আগস্ট স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কার ঘোষণা করেন। ঘোষণায় বলা হয়, একটি লাইট মেশিনগান (এলএমজি) উদ্ধার করতে পারলে সন্ধানদাতা পাবেন ৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া সাব মেশিনগানের (এসএমজি) জন্য দেড় লাখ, চায়না রাইফেলের জন্য ১ লাখ এবং পিস্তল ও শটগানের জন্য ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। আর প্রতি রাউন্ড গুলির জন্য মিলবে ৫০০ টাকা। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার এই ঘোষণার সময় পুলিশের হারিয়ে যাওয়া অস্ত্রের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৭৫টি এবং গুলি ছিল ২,৫৭,৮৪৯টি। পুরস্কার ঘোষণার পর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত মাত্র ৩৫টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ১৯০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো ১ হাজার ৩৪০টি অস্ত্র এবং ২,৫৭,৬৫৯ রাউন্ডেরও বেশি গুলি কোথায় তা অজানা। এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে : রাইফেল, সাব-মেশিনগান (এসএমজি), হালকা মেশিনগান (এলএমজি), বিভিন্ন ক্যালিবারের পিস্তল, শটগান, গ্যাসগান এবং টিয়ারগ্যাস লঞ্চার ।
পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র জানায়, লুট হওয়া বা খোয়া যাওয়া অস্ত্রগুলো ইতিমধ্যেই বিভিন্ন হাতে চলে গেছে। অস্ত্রের ক্রেতা বা বাহকদের খুঁজে বের করতে সময় লাগবে। অনেক আগ্নেয়াস্ত্র হাত বদল করে অপরাধী গোষ্ঠীর কাছে বিক্রি করা হয়েছে। আবার কিছু অস্ত্র ও গুলি ভয়ে নদীতে বা জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হতে পারে। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরি¯ি’তির ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, এমন আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে নির্বাচনের আগে সরকার নতুন আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স প্রদান স্থগিত রেখেছে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ঢাকা জেলা প্রশাসন প্রায় ৪৫টি লাইসেন্স প্রদান করেছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত বিগত আওয়ামী লীগ সরকার প্রায় ১৭ হাজার ২০০টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান করে। অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন এসব আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ¯’গিত করে। ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৩৪০টি জমা পড়ে। ৩ হাজার ৮৬০টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো জমা দেওয়া হয়নি। যারা অস্ত্র ও লাইসেন্স আত্মসমর্পণ করেনি তাদের ঐসব আগ্নেয়াস্ত্র এখন ‘অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র’ বলে ঘোষণ দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান প্রেক্ষাপটে লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ৭৭ শতাংশ আগ্নেয়াস্ত্র এরই মধ্যে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ২৩ শতাংশ অস্ত্র উদ্ধারে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, নিয়মিত সকল কার্যক্রমের পাশাপাশি আমরা অস্ত্র উদ্ধারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
-সুশান্ত সাহা










