গভীর সংকটে ফিলিস্তিনের অর্থনীতিঃ ঋণ ও বেকারত্বের চাপে ধ্বসে পড়ছে রাষ্ট্রব্যবস্থা

গাজা উপত্যকা থেকে পশ্চিম তীর—ফিলিস্তিনের সর্বত্রই এখন ধ্বংসস্তূপের গন্ধ। তবে এই দৃশ্যমান ধ্বংসযজ্ঞের আড়ালে আরও একটি নিঃশব্দ ধস নামছে, তা হলো দেশটির অর্থনীতি। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, ইসরায়েলি কঠোর অবরোধ এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার অভাবে ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রব্যবস্থা এখন দেউলিয়া হওয়ার পথে। রেকর্ড বেকারত্ব, আকাশচুম্বী ঋণ এবং উৎপাদন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ফিলিস্তিন এক নজিরবিহীন মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়েছে।

বেকারত্বের বিষফোড়াঃ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং ফিলিস্তিনি পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, গাজা উপত্যকায় বেকারত্বের হার বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশের কাছাকাছি। ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের ফলে শিল্পকারখানা, কৃষি জমি এবং ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে কর্মক্ষম মানুষের বিশাল এক অংশ এখন পুরোপুরি ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল। পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলি চেকপোস্টের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং যাতায়াত সীমাবদ্ধ হওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে।

ঋণের ভারে জর্জরিত রাষ্ট্রকাঠামোঃ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (PA) আর্থিক অবস্থা এখন মুমূর্ষু। ইসরায়েল কর্তৃক সংগৃহীত ফিলিস্তিনি করের টাকা (ট্যাক্স রেভিনিউ) আটকে রাখা এবং আন্তর্জাতিক দাতাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অর্থ না আসায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফিলিস্তিনের ব্যাংকিং খাত এখন ঋণের ভারে ন্যুব্জ। সরকারি ও বেসরকারি খাতের ঋণের পরিমাণ এতটাই বেড়ে গেছে যে, ব্যাংকিং ব্যবস্থা যেকোনো সময় ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অবকাঠামো ও উৎপাদন ব্যবস্থার ধ্বংসযজ্ঞঃ বিশ্লেষকদের মতে, গাজার মোট অবকাঠামোর প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পানি শোধন প্রকল্প এবং টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনধারণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কৃষি খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কয়েক দশক সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গাজার মাছ ধরা এবং ক্ষুদ্র কুটির শিল্প—যা একসময় অর্থনীতির প্রাণ ছিল—তা এখন কেবলই স্মৃতি।

আন্তর্জাতিক সহায়তার অপ্রতুলতাঃ ফিলিস্তিনের অর্থনীতি মূলত বৈদেশিক সাহায্যের ওপর টিকে থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক মনোযোগ ইউক্রেন বা অন্যান্য সংকটের দিকে সরে যাওয়ায় এবং ইউএনআরডব্লিউএ (UNRWA)-এর মতো সংস্থায় অর্থায়ন নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হওয়ায় ফিলিস্তিনিরা সাহায্যের অভাবে ধুঁকছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ, জ্বালানি এবং খাদ্য আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল যুদ্ধবিরতি ফিলিস্তিনের এই সংকট দূর করতে পারবে না। ফিলিস্তিনি অর্থনীতির পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৫০ বিলিয়ন ডলারের একটি দীর্ঘমেয়াদী আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা। তবে ইসরায়েলের কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে যেকোনো অর্থনৈতিক সাহায্যই বৃথা যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

পরিশেষে, ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রব্যবস্থা এখন কেবল একটি রাজনৈতিক সত্তা নয়, বরং একটি ধ্বসে পড়া অর্থনীতির চূড়ান্ত উদাহরণ। দ্রুত বৈশ্বিক হস্তক্ষেপ না হলে এই অঞ্চলে কেবল মানবিক বিপর্যয়ই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অনিবার্য।

-এম. এইচ. মামুন