বাকরির প্রয়াণে শোকের ছায়া, ফিলিস্তিনি চলচ্চিত্রে অপূরণীয় ক্ষতি

প্রখ্যাত ফিলিস্তিনি অভিনেতা ও পরিচালক মোহাম্মদ বাকরি আর নেই। ৭২ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে ফিলিস্তিনি চলচ্চিত্র ও থিয়েটার অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমেছে। বাকরির পরিবার ও ছেলে, অভিনেতা সালেহ বাকরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। বাকরিকে শেষ বিদায় দেওয়া হয় উত্তর ইসরায়েলের আল-বিনে গ্রামে, যেখানে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

মোহাম্মদ বাকরির অভিনয় জীবন শুরু হয় আশি ও নব্বইয়ের দশকে। ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি থিয়েটার ও চলচ্চিত্রের মঞ্চে তিনি ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেন। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পান গ্রিক-ফরাসি পরিচালক কস্তা-গাভরাসের ‘হানা কে’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে। ১৯৮৪ সালে উরি বারবাশ পরিচালিত ‘বিয়ন্ড দ্য ওয়ালস’ সিনেমায় ফিলিস্তিনি কয়েদির চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান। সিনেমাটি পরবর্তীতে একাডেমি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয়।

অভিনয়ের পাশাপাশি বাকরি ছিলেন সাহসী পরিচালক। ২০০২ সালে তিনি পরিচালিত প্রামাণ্যচিত্র ‘জেনিন, জেনিন’ বিশ্বজুড়ে পরিচিতি এনে দেয়, তবে বিতর্কও সৃষ্টি করে। অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেনিন শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানের ভয়াবহতা তুলে ধরে এই সিনেমাটি দীর্ঘদিন পর্যন্ত ইসরায়েলে নিষিদ্ধ ছিল। ২০২২ সালে সুপ্রিম কোর্টও সিনেমার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আবেদন নাকচ করে দেয়। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বাকরি শুধুমাত্র মানবিক ও রাজনৈতিক সত্যের প্রতিচ্ছবি দেখান, বরং সাহসী চলচ্চিত্র নির্মাণের পথও দেখান।

চলচ্চিত্র ও থিয়েটারে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি বহু প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে ছিলেন। অভিনয়, নির্দেশনা এবং রাজনৈতিক সাহস—এগুলো মিলিয়ে তিনি ফিলিস্তিনি সংস্কৃতির এক অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠেন। তাঁর প্রয়াণে সহকর্মী, অনুরাগী ও সমালোচকেরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁরা মনে করিয়ে দিয়েছেন যে বাকরি কেবল একজন দক্ষ অভিনেতা ও পরিচালকই ছিলেন না, বরং তিনি নিজের শেকড় এবং মানুষের অধিকারের প্রতি দায়বদ্ধ এক নির্ভীক কণ্ঠস্বরও ছিলেন।

বাকরি শুধু চলচ্চিত্রেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। মঞ্চনাটকে তিনি ফিলিস্তিনি সমাজ ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলো তুলে ধরার জন্য পরিচিত ছিলেন। এমিল হাবিবির বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য সিক্রেট লাইফ অফ সাঈদ: দ্য পেসঅপ্টিমিস্ট’ অবলম্বনে তৈরি তাঁর একক নাটক ‘বাকরিস মনোলোগ’ দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। নিজের পরিচয় ও জাতির অধিকারের জন্য তিনি কখনো আপসহীন ছিলেন না।

বাকরির জীবন ও কর্ম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে শিল্প ও সাহস কখনো আলাদা নয়। তাঁর সিনেমা ও নাটক কেবল বিনোদন দেয়নি, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতার জন্য শক্তিশালী বার্তাও বহন করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তিনি ফিলিস্তিনি সংস্কৃতি ও প্রতিভার পরিচয় তুলে ধরেছেন। তাঁর প্রয়াণের সঙ্গে ফিলিস্তিনি চলচ্চিত্র অঙ্গন এক গুরুত্বপূর্ণ কলাকে হারালো, কিন্তু বাকরির কাজ ও নীতি আগামী প্রজন্মের জন্য অবিচল প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

মোহাম্মদ বাকরির প্রয়াণ কেবল একটি ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এটি ফিলিস্তিনি শিল্প, সংস্কৃতি ও মানবাধিকারের জন্যও এক বড় ধাক্কা। তিনি ছিলেন সেই কণ্ঠস্বর, যিনি সাহসের সঙ্গে সত্য বলতেন, মানুষের অধিকার ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতেন এবং তার মাধ্যমেই বিশ্বকে দেখিয়েছেন ফিলিস্তিনি মানুষের সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়।

বিথী রানী মণ্ডল/