বাড়ছে শীত, এরই মাঝে কুয়াশা, শৈত্যপ্রবাহ ও বাংলার বহুমাত্রিক জীবন

মৌসুমের প্রথম শীতের ছোঁয়া নামতেই প্রকৃতি বদলে যেতে শুরু করেছে। বাতাসে জমেছে শীতের আবেশ, ভোরের আকাশ ঢেকে যাচ্ছে ঘন কুয়াশায়। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, তাপমাত্রা ধীরে ধীরে আরও কমতে পারে, এবং মৌসুমের প্রথম মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তার লাভ করতে পারে। বিশেষ করে উত্তরের জেলাগুলোতে শীতের তীব্রতা আগেভাগেই অনুভূত হচ্ছে। কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর, শিশিরভেজা ঘাস, নরম রোদ—সব মিলিয়ে শীত বাংলার প্রকৃতিতে নিয়ে আসে এক ধীর, শান্ত অথচ গভীর পরিবর্তন।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরেরে দেয়া তথ্য অনুযায়ী :

উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ এবং দুর্বল আবহাওয়া বিরাজ করছে। মৌসুমি বায়ুর স্বাভাবিক প্রবাহ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় আছে। এর একটি দুর্বল লঘুচাপ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে।

আজ (২১.১২.২০২৫) তারিখ সকাল ০৯ টা থেকে পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর।

প্রথম দিন (২১.১২.২০২৫) তারিখ সকাল ০৯ টা থেকে :

দেশের অধিকাংশ জায়গায় আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। আকাশ সারা দেশে অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা থাকতে পারে। রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে এবং দিনের তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে। বায়ুপ্রবাহ উত্তর/উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে (০৮–১২) কি.মি./ঘণ্টা।

সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা (ঢাকা): সর্বনিম্ন : ১৫° সে. ও সর্বোচ্চ : ২৭° সে.

দ্বিতীয় দিন (২২.১২.২০২৫) তারিখ সকাল ০৯ টা থেকে :

দেশের অধিকাংশ জায়গায় আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। আকাশ সারা দেশে অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা থাকতে পারে। সারাদেশে রাত ও দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

তৃতীয় দিন (২৩.১২.২০২৫) তারিখ সকাল ০৯ টা থেকে :

দেশের অধিকাংশ জায়গায় আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। আকাশ সারা দেশে অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা থাকতে পারে। সারাদেশে রাত ও দিনের তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে।

চতুর্থ দিন (২৪.১২.২০২৫) তারিখ সকাল ০৯ টা থেকে :

দেশের অধিকাংশ জায়গায় আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। আকাশ সারাদেশে ভোরের দিকে হালকা থেকে মাঝারি কুয়াশা পড়তে পারে এবং দেশের অন্যত্র কোথাও কোথাও হালকা কুয়াশা পড়তে পারে।সারাদেশে রাত ও দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

পঞ্চম দিন (২৫.১২.২০২৫) তারিখ সকাল ০৯ টা থেকে :

দেশের অধিকাংশ জায়গায় আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। আকাশ সারাদেশে ভোরের দিকে হালকা থেকে মাঝারি কুয়াশা পড়তে পারে এবং দেশের অন্যত্র কোথাও কোথাও হালকা কুয়াশা পড়তে পারে। সারাদেশে রাত ও দিনের তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে।

শীত কেবল আবহাওয়ার পরিবর্তন নয়; এটি মানুষের জীবনযাপন, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। একদিকে শীত সৌন্দর্য ও উৎসবের বার্তা নিয়ে আসে, অন্যদিকে উন্মোচন করে সমাজের কঠিন বৈষম্য ও বঞ্চনার চিত্র।

শীতের কঠিন মুখ: প্রান্তিক মানুষের সংগ্রাম

এই ঋতু সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে সমাজের প্রান্তিক মানুষদের ওপর। কনকনে ঠান্ডা, ঘন কুয়াশা আর শৈত্যপ্রবাহে গৃহহীন ও ছিন্নমূল মানুষের জীবন হয়ে ওঠে অনিশ্চিত। ফুটপাতে, রেলস্টেশনে কিংবা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো মানুষের জন্য শীত মানে অসহনীয় সংগ্রাম। শীতবস্ত্রের অভাব, অপুষ্টি আর আশ্রয়হীনতা অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। শীত এখানে আর প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়; এটি বেঁচে থাকার লড়াই।

ঘন কুয়াশা শীতের আরেকটি ভয়ংকর দিক। ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত সড়ক, নৌপথ ও রেলপথে দৃশ্যমানতা কমে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। নদীপথে লঞ্চ চলাচল ব্যাহত হয়, সড়কে ঘটে দুর্ঘটনা, কর্মজীবী মানুষ কর্মস্থলে পৌঁছাতে পড়ে চরম ভোগান্তিতে। কুয়াশা যেন জীবনের গতিকে সাময়িকভাবে স্থবির করে দেয়।

স্বাস্থ্যঝুঁকিও শীতে বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, সর্দি-কাশি ও ঠান্ডাজনিত নানা রোগের প্রকোপ দেখা দেয়। গ্রামাঞ্চলে পর্যাপ্ত উষ্ণতার অভাব ও চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। সামান্য অসুখও অনেক সময় মারাত্মক রূপ নেয়।

কৃষিতেও শীত সবসময় আশীর্বাদ হয়ে আসে না। অতিরিক্ত ঠান্ডা ও কুয়াশায় বোরো বীজতলা, শাকসবজি ও রবিশস্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিশিরে পুড়ে যায় কচি চারা, ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এতে কৃষকের পরিশ্রম ও বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়ে।

শীতে জীবিকা হারানোর বাস্তবতাও আছে। দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিক, নৌযানশ্রমিক কিংবা খোলা জায়গায় কাজ করা মানুষদের কর্মঘণ্টা কমে যায়। কাজ বন্ধ থাকলে সংসারে নেমে আসে অভাবের ছায়া। শীত তাদের কাছে অবকাশের সময় নয়, বরং উপার্জন হারানোর মৌসুম।

এই সব কঠিন বাস্তবতার ভেতর দিয়েই যেন হেঁটে যায় সেই চেনা কবি সুফিয়া কামালের কবিতার প্রতীক—

“কুহেলী উত্তরী তলে মাঘের সন্ন্যাসী—
গিয়াছে চলিয়া ধীরে পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে
রিক্ত হস্তে।”
এই ‘মাঘের সন্ন্যাসী’ কেবল কবিতার চরিত্র নয়; সে শীতের রিক্ততার রূপক—যে আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শীতের রোদ সবার জন্য সমান উষ্ণ নয়।

শীতের সংস্কৃতি, সাহিত্য উৎসবের উষ্ণতা

শীত মানেই কেবল কষ্ট নয়। এই ঋতু বাংলার সংস্কৃতিতে এনে দেয় অনন্য উষ্ণতা। পৌষসংক্রান্তি, পিঠা উৎসব, গ্রামীণ মেলা, লোকগান, বাউল আর পালাগানের আসর—সবকিছু যেন শীতের নরম রোদের অপেক্ষায় থাকে। ঢেঁকির তালে তালে চাল ভাঙার ছন্দ, মাটির চুলায় পিঠা ভাপার দৃশ্য, খোলা মাঠে বসে গান শোনার আনন্দ—এসবই বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

শীতের সকালে শঙ্খের ধ্বনি বা আজানের সঙ্গে মিশে থাকা কুয়াশামোড়া নীরবতা গ্রামবাংলায় তৈরি করে এক অনির্বচনীয় সুর। পিঠা-পুলিকে ঘিরে গড়ে ওঠে নারীদের মিলনমেলা—যেখানে গল্প, স্মৃতি আর আন্তরিকতার উষ্ণতা শীতকে হার মানায়। শিশুদের মিষ্টি রোদে চিড়া-মুড়ি-খেজুর গুড় খাওয়া, ভাপা পিঠা খাওয়া আর হাসিখুশি মুখ—এসব মিলেমিশে গ্রামীণ শীতের সকালকে করে তোলে আরও উষ্ণ, আরও মধুর।

সাহিত্যেও শীত এক গভীর অনুভব। কবিতা, গল্প ও গানে শীত কখনো প্রেমময়, কখনো বিষণ্ন, কখনো প্রতিবাদের প্রতীক। “মাঘের সন্ন্যাসী” যেন শীতের সেই শূন্যতার ভাষ্য—যেখানে সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে অভাব ও বৈষম্যের দীর্ঘশ্বাস।

শীতের অর্থনীতি: ব্যবসা কৃষি

শীতের সঙ্গে সমান্তরালভাবে শীত উসকে দেয় অর্থনীতিরও একটি মৌসুমি চাকা। শীত নামলেই গরম কাপড়ের বাজারে আসে ব্যস্ততা। ফুটপাতের দোকান থেকে শুরু করে অভিজাত শপিংমল—সবখানেই শীতবস্ত্রের চাহিদা বেড়ে যায়। লেপ-তোশক, সোয়েটার, শাল, মাফলার—এই সব পণ্যের বাজারে কর্মসংস্থান তৈরি হয় অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কারিগর ও ফেরিওয়ালার জন্য।

পিঠা-পুলির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক বিশাল ক্ষুদ্র অর্থনীতি। আতপ চাল, খেজুর গুড়, নারকেল, দুধ—এই সব পণ্যের বাজার শীতে হঠাৎ করেই চাঙা হয়ে ওঠে। খেজুরের রস সংগ্রহকারী গাছি থেকে শুরু করে গুড়ের ব্যবসায়ী, চালকলের শ্রমিক—সবার জীবনে শীত নিয়ে আসে কাজের সুযোগ। শহরের অলিগলিতে গড়ে ওঠা ভাপা-পিঠার স্টলগুলো শীতের রাতে মানুষের আবেগ আর স্বাদের মিলনস্থল হয়ে ওঠে।

শীতের সঙ্গে কৃষির সম্পর্কও নিবিড়। ধান কাটাও, বোরো আবাদ, শাকসবজি চাষ—শীত কৃষকের জন্য পরিশ্রমের আর সম্ভাবনার ঋতু। ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর, শিম, টমেটোর মাঠ শীতেই সবচেয়ে রঙিন হয়। এই সবজির সরবরাহ গ্রাম থেকে শহরে পৌঁছাতে তৈরি হয় পরিবহন, আড়ত ও খুচরা বাজারের সচল শৃঙ্খল—যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্ত ভিত দেয়।

খেলাধুলা প্রাণচাঞ্চল্য

শীত কেবল প্রকৃতি বা উৎসবের নয়—এটি খেলাধুলারও সময়। কুয়াশা ভেদ করে ওঠা নরম রোদের নিচে গ্রামবাংলার মাঠে ফিরে আসে প্রাণচাঞ্চল্য। শীত নামলেই শুরু হয় হা-ডু-ডু, দাড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, কানামাছি, বৌচি, লাঠিখেলার আয়োজন। এই খেলাগুলো শুধু বিনোদন নয়; এগুলো গ্রামীণ সংস্কৃতির উত্তরাধিকার, সামাজিক বন্ধন ও শরীরচর্চার অনন্য মাধ্যম। শহরেও শীত মানেই ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্টের মৌসুম। কুয়াশার ভেতর দৌড়াতে দৌড়াতে শরীর গরম হয়ে ওঠে, আর খেলাধুলা হয়ে ওঠে শীত জয় করার আনন্দময় ভাষা।

দ্বৈত চরিত্রের ঋতু

শীতের একদিকে রয়েছে উৎসব, সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও স্মৃতির উষ্ণতা; অন্যদিকে রয়েছে অভাব, বঞ্চনা ও কঠিন বাস্তবতা। শীত আমাদের আনন্দ দেয়, আবার প্রশ্নও তোলে—কে উষ্ণ, কে বঞ্চিত? সে কারণেই শীত শুধু একটি ঋতু নয়। এটি বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি ও জীবনের এক গভীর, বহুমাত্রিক অনুভব—যেখানে কুয়াশা, শিশির, পিঠা, খেলা, ব্যবসা ও মানবিক দায়িত্ব একাকার হয়ে যায়।

শীত আসে কুয়াশা, শিশির, পিঠা, খেলাধুলা, রোদের সঙ্গে—আবার আসে অসহায় মানুষের দীর্ঘশ্বাস। এটি আনন্দ ও সংগ্রামের এক ঋতু, সৌন্দর্য ও বাস্তবতার সহাবস্থান, বাংলার জীবনের বহুমাত্রিক প্রতিচ্ছবি।

দুচোখ বন্ধ করলেই মনের পর্দায় ভেসে উঠে হাড়কনকনে শীতে জবুথুবু একটি গ্রামের ভোর। এ দৃশ্যপট বাৎসরিক ক্যালেন্ডারের পাতায় না থাকলে যেন ক্যালেন্ডারের পরিপূর্ণতাই পায়না। শীতের শিশির ভেজা ভোরের দৃশ্য আহা কি অপরূ, উদীয়মান সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত গ্রামীণ বাড়ির উঠোন। চাদর মুড়ি দেয়া মানুষ, নিঃস্তব্ধ প্রকৃতি ধোঁয়াশা উজ্জ্বল, নরম এবং কোমলতায় ভরা প্রকৃতি। চিত্রশিল্পীরা শীতের প্রকৃতি ছবি আঁকতেও ভালোবাসে। জলরং চিত্র আসলেই যেন শীতের সকালে খুব ভালো হয়। গাম্ভীর্যময় বৈশিষ্ট্যের জন্যই যেন শীতের সকাল বছরের অন্যান্য ঋতুর সকাল থেকে স্বতন্ত্র। কবি সুকান্ত তাই বলেছেন,

‘শীতের সকাল
দরিদ্রের বস্ত্রের আকাল
শীতের সকাল
অসাম্যের কাল
ধনীর সুখ আর আনন্দ
শ্রেণী সংগ্রাম এ নিয়ে চলে দ্বন্দ্ব।’

শীত আমাদের দায়বদ্ধতাও মনে করিয়ে দেয়। এই ঋতু প্রশ্ন তোলে—কে উষ্ণ, কে বঞ্চিত? কে উৎসবে, কে সংগ্রামে? শীতের সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই বৈষম্যই আমাদের মানবিক দায়িত্বের কথাও উচ্চারণ করে।

মানসুরা মানজিল চৈতী / আবদুল মোমিন