পঞ্চগড়কে বলা হয় বিএনপির রাজনৈতিক ‘দুর্গ’। এবারের জাতীয় নির্বাচনে জেলার দুটি আসনেই জয় পেয়েছে দলটি। তবে আসন দুটি রক্ষায় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সংখ্যালঘুরাই মূলত বিএনপির মান বাঁচিয়েছে। এখানে জামায়াতে ইসলামীর ভোটের উল্লেখযোগ্য উত্থান ঘটেছে।
পঞ্চগড়-১ আসন বিএনপির ঘাঁটি বলে পরিচিত থাকলেও এবারের নির্বাচন নৌকাবিহীন হওয়ায় সংখ্যালঘুদের ভোটেই জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে। এ আসনে বিএনপির ব্যারিস্টার নওশাদ জমির ধানের শীষ প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ১৬৯। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম শাপলা কলি প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯ ভোট। আসনটিতে ধানের শীষ প্রতীক মাত্র ৮ হাজার ১২০ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছে।
আসনটি বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিতি থাকলেও এনসিপির সারজিস আলম কঠিন প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এ আসনের অন্তত ২০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোট। এ ছাড়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোটও ধানের শীষের বাক্সে গেছে ধারণা স্থানীয়দের। এ আসনে ভোট পড়েছে ৭৭ দশমিক ৪১ শতাংশ। বিপুল সংখ্যক ভোটারের উপস্থিতিই সারজিস আলমের পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে।
পঞ্চগড়-১ আসনে ১৯৯১ সালে বিএনপির হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ। পরে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে টানা দুইবার এখানে এমপি হন সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দীন সরকার। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আসনটি হাতছাড়া হয় বিএনপির। এরপর দীর্ঘ সময় আসনটি কুক্ষিগত করে রাখে আওয়ামী লীগ। অবশেষে সেই হারানো আসন পুনরুদ্ধার করলেন তারই ছেলে। তবে নওশাদ জমির গতানুগতিক রাজনীতির বাইরে এসে ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও সুসংগঠিত প্রচারণার মাধ্যমে ভোটারদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হন। ঘরে ঘরে গিয়ে জনসংযোগে সংযত ভাষা ও পরিমিত রাজনীতি আচরণ তাকে নিয়ে যায় এক অনন্য উচ্চতায়। এক্ষেত্রে তার পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পঞ্চগড়-২ আসনও এবারের নির্বাচনে সনাতনী ভোটই হয়ে উঠেছে মূল ফ্যাক্টর। শক্ত অবস্থান ও নিজস্ব ভোটব্যাংক থাকা সত্ত্বেও সনাতনী ভোট না পাওয়ায় ভরাডুবি হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. সফিউল আলমের। অন্যদিকে এই ভোটেই বড় ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেছেন বিএনপির প্রার্থী ফরহাদ হোসেন আজাদ।
ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, ফরহাদ হোসেন আজাদ পেয়েছেন ১ লাখ ৭৪ হাজার ৬৫০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সফিউল আলম পেয়েছেন ১ লাখ ২৮ হাজার ৮৬২ ভোট। ফলে ৪৫ হাজার ৭৮৮ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন বিএনপি প্রার্থী। এ আসনে ভোট পড়েছে ৭৭ দশমিক ১৯ শতাংশ।
পঞ্চগড়-২ আসনটি বোদা উপজেলা ও দেবীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত। মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ১৪ হাজার ৩৫৩ জন। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার সনাতনী ভোটার রয়েছেন-যা পুরো নির্বাচনী সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলেছে।
এদিকে স্থানীয়ভাবে জামায়াতের একটি স্থায়ী ও সংগঠিত ভোটব্যাংক রয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে ধারণা ছিল। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন এলাকায় তাদের প্রচারণাও ছিল দৃশ্যমান। তবে ভোটের চূড়ান্ত ফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, নিজস্ব সমর্থন ধরে রাখলেও অতিরিক্ত ভোট টানতে ব্যর্থ হয়েছে দলটি। বিশ্লেষকদের মতে, সনাতনী সম্প্রদায়ের ভোটারদের বড় একটি অংশ কৌশলগতভাবে বিএনপি প্রার্থীর দিকে ঝুঁকে পড়েন। সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন ইস্যুতে আশ্বাস পাওয়ায় তারা বিএনপির প্রতীকে ভোট দিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব কেন্দ্রে সনাতনী ভোটারের সংখ্যা বেশি, সেসব কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থী উল্লেখযোগ্য লিড পেয়েছেন। ফলে সামগ্রিক ব্যবধানে বড় ফারাক তৈরি হয়।
পঞ্চগড় জেলা বিএনপির আহ্বায়ক জাহিরুল ইসলাম কাচ্চু বলেন, আমরা দুটি আসনে পেয়েছি। আমি পঞ্চগড় জেলা বিএনপির কনভেনার। আলহামদুলিল্লাহ আমরা চেষ্টা করেছি, দুটি আসনেই পেয়েছি।
পঞ্চগড়-১ আসনে অল্প ভোটে বিজয়ের কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এ আসনটা একটু ব্যতিক্রম আছে। প্রার্থী সাধারণত যে সব লোকজন নিয়ে নির্বাচন করেছেন, তাদের মানুষ ওইভাবে চিনেও না, জানেও না। নির্বাচনটা প্রার্থীর ভাই এককভাবে করেছিলেন। শেষের দিকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। আমরা কাজ করেছি।
–আব্দুল্লাহ্ আল মামুন, পঞ্চগড়










