আমরা ভুলে যাই যেসব কারনে

মাঝে মাঝে কি এমন হয় যে, আপনি কোনো একটি ঘরে ঢুকলেন কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছেন না কেন সেখানে এসেছেন? কিংবা খুব পরিচিত কারো নাম হুট করে মনে পড়ছে না। আমাদের অনেকের সাথেই এমনটা ঘটে। সাধারণত আমরা একে সাধারণ ভুলোমনা স্বভাব বলে এড়িয়ে যাই।

ভুলে যাওয়ার এই রোগ বা স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়াটা সবসময় স্বাভাবিক নয়। এটি হুট করে হয় না, বরং আমাদের জীবনযাত্রার নানা ভুল এবং শরীরের ভেতরের কিছু পরিবর্তনের কারণে ধীরে ধীরে দেখা দেয়। মস্তিষ্ক যখন তার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারাতে শুরু করে, তখন এই সমস্যাগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সচেতন থাকলে এবং কিছু বিষয় মেনে চললে আমরা আমাদের মেমোরি বা স্মৃতিশক্তিকে অনেকদিন সতেজ রাখতে পারি।

কেন আমরা ভুলে যাই? : আমাদের মস্তিষ্ক অনেকটা কম্পিউটারের হার্ড ড্রাইভের মতো কাজ করে। কিন্তু অতিরিক্ত চাপে পড়লে এটি অকেজো হতে শুরু করে। ভুলে যাওয়ার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা। আমরা যখন সারাক্ষণ কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত থাকি, তখন মস্তিষ্ক নতুন কোনো তথ্য গ্রহণ করার বা পুরনো তথ্য মনে রাখার শক্তি হারিয়ে ফেলে। ফলে সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আমাদের মন থেকে দ্রুত মুছে যেতে থাকে।

দ্বিতীয় কারণটি হলো পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব। আমাদের শরীর যেমন বিশ্রামের মাধ্যমে শক্তি ফিরে পায়, মস্তিষ্কও ঠিক তেমনি ঘুমের সময় সারাদিনের স্মৃতিগুলোকে গুছিয়ে রাখে। আপনি যদি নিয়মিত সাত থেকে আট ঘণ্টা না ঘুমান, তবে মস্তিষ্কের সেই গোছানোর কাজে ব্যাঘাত ঘটে। এর ফলেই শুরু হয় ভুলে যাওয়ার প্রবণতা।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের শরীরে যেমন পরিবর্তন আসে, মস্তিষ্কের কোষেও তেমন পরিবর্তন ঘটে। বয়সজনিত কারণে স্মৃতিশক্তি কিছুটা কমে যাওয়া স্বাভাবিক। তবে একে জয় করা সম্ভব যদি আমরা মস্তিষ্ককে সচল রাখি। এছাড়া ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা এবং অতিরিক্ত উদ্বেগ মানুষের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। মনোযোগ কম থাকলে কোনো বিষয় মনে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

শরীরের ভেতর পুষ্টির অভাব থাকলেও এই সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে ভিটামিন বি১২, ভিটামিন ডি এবং আয়রনের ঘাটতি হলে স্মৃতিভ্রংশ হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। এছাড়াও থাইরয়েড হরমোনের অসামঞ্জস্যতা এবং বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন মেমোরি লসের বড় কারণ। ডিপ্রেশন মানুষের মনোযোগ কমিয়ে দেয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে মনে রাখার ক্ষমতার ওপর। অনেক সময় বিভিন্ন রোগের জন্য আমরা যে ওষুধ সেবন করি, তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও স্মৃতিশক্তি সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে। বিশেষ করে ঘুমের ওষুধ বা কড়া ব্যথানাশক ওষুধ এই ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে।

কখন সতর্ক হবেন : ভুলে যাওয়া কখন সাধারণ আর কখন এটি রোগের পর্যায়ে পড়ে, তা বোঝা জরুরি। আপনি যদি দেখেন যে খুব চেনা ও কাছের মানুষের নাম আপনি বারবার ভুলে যাচ্ছেন, তবে বুঝতে হবে সমস্যাটি গভীর। এছাড়াও যদি একই কথা বা প্রশ্ন বারবার করতে থাকেন, কিংবা প্রতিদিনের সাধারণ কাজগুলো করতেও সমস্যা হয়, তবে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। অনেক সময় মানুষ জায়গা বা সময় নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন, যেমন পরিচিত রাস্তায় গিয়েও পথ হারিয়ে ফেলা। এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে মোটেও অবহেলা করা ঠিক হবে না।

স্মৃতিশক্তি বাড়াতে যা করবেন : স্মৃতিশক্তি ভালো রাখা খুব কঠিন কিছু নয়, যদি আপনি সঠিক নিয়ম মেনে চলেন। প্রথমেই নজর দিতে হবে খাবারের দিকে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রচুর শাকসবজি, সামুদ্রিক মাছ এবং বাদাম রাখার চেষ্টা করুন। এগুলো মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। শরীরকে সুস্থ রাখতে এবং ডিহাইড্রেশন এড়াতে প্রচুর জল পান করুন।

মস্তিষ্ককে সবসময় সচল রাখার জন্য কিছু মানসিক ব্যায়ামের প্রয়োজন হয়। নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। অবসর সময়ে ধাঁধা সমাধান করা বা সুডোকু খেলার মতো কাজগুলো আপনার মস্তিষ্ককে শাণিত করবে। নতুন কোনো দক্ষতা বা ভাষা শেখার চেষ্টা করাও স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর দারুণ একটি উপায়।

মানসিক চাপ কমানোর জন্য নিয়মিত হাঁটাহাঁটি বা যোগব্যায়াম করুন। প্রকৃতির মাঝে সময় কাটালে মন ভালো থাকে এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়ে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, নিজেকে হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করুন এবং সামাজিক যোগাযোগ বাড়ান। প্রিয়জনদের সাথে সময় কাটালে দুশ্চিন্তা কম হয়, যা পরোক্ষভাবে আপনার স্মৃতিকে ধরে রাখতে সাহায্য করবে।

মনে রাখবেন, স্মৃতিই আমাদের অস্তিত্বের পরিচয়। তাই আজ থেকেই নিজের শরীরের পাশাপাশি মনের যত্ন নেওয়া শুরু করুন। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন আর সচেতনতাই পারে আপনার স্মৃতির পাতাকে সবসময় রঙিন আর উজ্জ্বল রাখতে। ভুলে যাওয়ার সমস্যাকে ভয় না পেয়ে সঠিক নিয়মে তার মোকাবিলা করাই হোক আমাদের লক্ষ্য।

মাহমুদ সালেহীন খান