গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ সর্বজনীন ভোটাধিকার

এই লেখাটি যখন তৈরি করছি তখন বাংলাদেশে ভোট হচ্ছে। নানা জায়গায় যোগাযোগ করে যতদূর জানতে পেরেছি প্রায় সব কেন্দ্রে মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ চলছে। সকালের দিকে ঢাকার বাইরে অনেক কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কম ছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটার উপস্থিতি বেড়েছে। অন্যদিকে সামাজিক অপসংবাদের ছড়াছড়ি। বুধবার দিবাগত রাতে এমন সব ভিডিও আপলোড করা হয়েছে, যেগুলো দেখে অনেকে বিভ্রান্ত হয়েছেন। আসলে সেসবের বেশির ভাগই ছিল অসত্য। পাঠক যখন লেখাটি পড়ছেন, তখন সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেছে। দেশের একদল মানুষ এখন উদ্যাপন করছে বিজয় উৎসব। যারা প্রত্যাশিত ফল পাননি বোধগম্য কারণেই তারা বিমর্ষ। কেউ কেউ ক্ষুব্ধ-ক্রুদ্ধ। গণতন্ত্রের শেষ কথা হলো জনগণের রায়। গণতন্ত্র মানলে জনগণের অধিকাংশের দেওয়া মতামত মাথা পেতে নিতে হবে। কারণ গণতন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রতীকী ভিত্তি হলো ভোটাধিকার। ‘জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য’-এই আদর্শ কেবল তখনই সার্থক হয়, যখন রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক সমানভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার ভোগ করেন। আমাদের দেশে সাংবিধানিকভাবে সর্বজনীন ভোটাধিকার স্বীকৃত হলেও বাস্তবে ভিন্নরূপ দেখার তিক্ত অভিজ্ঞতাও আমাদের রয়েছে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর স্বাধীন দেশে সর্বজনীন ভোটাধিকার স্বীকৃত হলেও গণতন্ত্রের পথ, বিশেষ করে পাকিস্তানে মসৃণ ছিল না। গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খেয়েছে রাজনৈতিক হঠকারিতা ও সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে।

সর্বজনীন ভোটাধিকার আধুনিক গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা। নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ, ধনী-গরিবনির্বিশেষে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের সমান ভোটাধিকার এই নীতিই গণতন্ত্রকে নৈতিক বৈধতা দেয়। তবে উপমহাদেশে এই নীতির প্রতিষ্ঠা ও প্রয়োগ ছিল জটিল, সংগ্রামময় এবং কখনো কখনো সংকটসঙ্কুল। পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ তিন রাষ্ট্রের ইতিহাসে আমরা গণতান্ত্রিক সাফল্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যেমন পাই, তেমনি পাই গভীর সংকট ও পেছনে হাঁটার উদাহরণ।

ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতবর্ষে ভোটাধিকার ছিল সীমিত ও শর্তসাপেক্ষ। ১৯০৯ সালের মিন্টো-র্মলে সংস্কার এবং ১৯১৯ সালের মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার সীমিত পরিসরে নির্বাচনিব্যবস্থা চালু করলেও তা ছিল সম্পত্তি, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কর প্রদানের শর্ত দ্বারা সীমায়িত। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন নির্বাচনের পরিধি বাড়লেও সর্বজনীন ভোটাধিকারের ধারণা তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বস্তুত উপমহাদেশে প্রকৃত সর্বজনীন ভোটাধিকার আসে দেশভাগের মধ্য দিয়ে দুটো নতুন রাষ্ট্র গঠনের পর।

১৯৫০ সালের সংবিধানে ভারত প্রাপ্তবয়স্ক সব নাগরিককে (প্রথমে ২১ বছর, পরে ১৮ বছর) ভোটাধিকার প্রদান করে। ১৯৫১ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচন ছিল বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক আয়োজন। নিরক্ষরতা, দারিদ্র্য ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এই নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হয়। ভারতের সাফল্যের মূল শক্তি ছিল একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, সাংবিধানিক কাঠামোর স্থায়িত্ব এবং সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। নিয়মিত নির্বাচন, ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর এবং বিচার বিভাগের সক্রিয়তা ভারতীয় গণতন্ত্রকে দৃঢ় ভিত্তি দেয়। যদিও ভারতে গণতন্ত্র ও তার সৌন্দর্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তবে ভারতও সংকটমুক্ত ছিল না। ১৯৭৫-৭৭ সালের জরুরি অবস্থা গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর বড় আঘাত হানে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, বিরোধী নেতারা গ্রেপ্তার হন। কিন্তু ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে জনগণের রায় জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে জনরায় প্রমাণ করে, সর্বজনীন ভোটাধিকার কেবল একটি আইনি অধিকার নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রতিরোধের শক্তিশালী হাতিয়ারও বটে।

পক্ষান্তরে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সর্বজনীন ভোটাধিকারের ইতিহাস পূর্বাপর অস্থির। ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সংবিধান প্রণয়ন বিলম্বিত হয়। ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র সর্বজনীন ভোটাধিকারের স্বীকৃতি দিলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।

১৯৫৮ সালে জেনারেল আইউব খানের সামরিক শাসন গণতান্ত্রিক ধারা রুখে দেয় বেসিক ডেমোক্র্যাসি চালুর মধ্য দিয়ে। মৌলিক গণতন্ত্রের নামে পরোক্ষ নির্বাচনি পদ্ধতি চালু হয়, যা প্রকৃত অর্থে সর্বজনীন ভোটাধিকারের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন ছিল পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম প্রকৃত সর্বজনীন ও তুলনামূলকভাবে অবাধ নির্বাচন। তাতে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরে অনীহা ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ফলেই ঘটে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। বাংলাদেশেও গণতন্ত্রের পথ মসৃণ নয়। সামরিক শাসন এবং কর্তৃত্ববাদী শাসন আমাদের গণতন্ত্রের পথ কণ্টকিত করেছে বারবার। ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। যদিও নিয়ম করে নির্বাচন হয়েছে।

অন্যদিকে পাকিস্তানে ২০০৮ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করলেও সামরিক ও অসামরিক শক্তির টানাপোড়েনে গণতন্ত্র এখনো সে দেশে শক্তিহীন। আজ সর্বজনীন ভোটাধিকারের যে ধারণাকে আমরা সমুন্নত রাখতে চাই, তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, বিতর্ক, আন্দোলন ও রক্তাক্ত ইতিহাস। বিশ্বে সর্বজনীন ভোটাধিকার কোনো এক বছরে বা একক সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এটি ছিল ধাপে ধাপে অর্জিত এক রাজনৈতিক বিবর্তন। প্রথম দিকে ভোটাধিকার ছিল কেবল ধনী, জমিদার বা করদাতা পুরুষদের জন্য সীমাবদ্ধ। সমাজের বৃহৎ অংশ নারী, শ্রমজীবী মানুষ, বর্ণগত বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এই অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করে। ১৮৯৩ সালে নিউজিল্যান্ড প্রথম দেশ হিসেবে নারীদের ভোটাধিকার প্রদান করে, যা বিশ্ব রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। তবে তখনো সব দেশে নারী-পুরুষের সমান রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ১৯০৬ সালে ফিনল্যান্ড নারী-পুরুষের সমান ভোটাধিকার নিশ্চিত করে এবং ১৯০৭ সালের সংসদ নির্বাচনে নারীরা কেবল ভোটই দেননি, প্রার্থী হিসেবেও অংশগ্রহণ করেন। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এটিই ছিল বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচন।

ব্রিটেনে ১৯১৮ সালে নারীদের আংশিক ভোটাধিকার দেওয়া হয়, কিন্তু বয়স ও সম্পত্তির শর্ত ছিল। অবশেষে ১৯২৮ সালে নারী-পুরুষ সমান ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯২০ সালে সংবিধানের ১৯তম সংশোধনীর মাধ্যমে নারীরা ভোটাধিকার পান। তবে বাস্তবে বর্ণবৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধার কারণে আফ্রিকান-আমেরিকান নাগরিকদের পূর্ণ ভোটাধিকার কার্যকর হতে আরও কয়েক দশক সময় লেগেছে। অর্থাৎ আইনগত স্বীকৃতি ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে ব্যবধানও ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

এই দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস আমাদের একটি মৌলিক সত্য স্মরণ করিয়ে দেয় যে ভোটাধিকার কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়; এটি রাজনৈতিক সমতা ও মানবিক মর্যাদার স্বীকৃতি। যখন একজন দরিদ্র কৃষক, একজন শ্রমিক, একজন নারী কিংবা কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য একই ব্যালট বাক্সে সমান শক্তিতে ভোট প্রদান করেন, তখনই গণতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তি দৃঢ় হয়।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়, সর্বজনীন ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হলেই কি গণতন্ত্র পূর্ণতা পায়? ইতিহাস বলে, কেবল ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলেই গণতন্ত্র কার্যকর হয় না। প্রয়োজন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন; প্রয়োজন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা; প্রয়োজন রাষ্ট্রযন্ত্রের নিরপেক্ষতা। অনেক দেশেই সর্বজনীন ভোটাধিকার আইনগতভাবে স্বীকৃত, কিন্তু নির্বাচনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে দেখা যায়। ফলে গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি কেবল ভোটাধিকারের ওপর নয়, বরং তা নির্ভর সেই ভোটের সুষ্ঠু প্রয়োগের পরিবেশের ওপরও।

আজকের গণতান্ত্রিক বিশ্বে সর্বজনীন ভোটাধিকার সর্বত্র স্বীকৃত নীতি। তবু কোনো কোনো দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন, কিংবা একদলীয় কর্তৃত্ববাদ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। আবার কোথাও কোথাও ভোটার দমন, ভুয়া তথ্যের বিস্তার, কিংবা প্রশাসনিক অপব্যবহার নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এসব বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সর্বজনীন ভোটাধিকার অর্জন এক ঐতিহাসিক বিজয় হলেও, তা রক্ষা করা আরও বড় দায়িত্ব।

বাংলাদেশসহ বহু উন্নয়নশীল দেশের জন্য সর্বজনীন ভোটাধিকারের ইতিহাস বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা ত্যাগের ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত। তাই সর্বজনীন ভোটাধিকারের ধারণাকে কেবল একটি সাংবিধানিক রীতি হিসেবে নয়, বরং একটি নৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। ভোট যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে ওঠে; বরং নাগরিকের আস্থা ও অংশগ্রহণের বাস্তব মাধ্যম হয়ে উঠুক-এমনটাই প্রত্যাশিত। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে পরবর্তী ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্য অনেক রাজনৈতিক শক্তি কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে। নিজেরা আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে গণতন্ত্রের পথ রচনা করে নিজেরাই আবার সে পথে কাঁটা বিছিয়ে দেয়। এই মানসিকতা পরিত্যাজ্য।

বিশ্ব ইতিহাসের আলোকে বলা যায়, সর্বজনীন ভোটাধিকার মানবসভ্যতার এক অনন্য অর্জন। এটি আমাদের শিখিয়েছে-রাজনৈতিক সমতা হঠাৎ করে পাওয়া যায় না; তা আদায় করে নিতে হয়। আজকের প্রজন্মের দায়িত্ব হলো সেই অর্জনকে সংরক্ষণ করা, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একটি কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হস্তান্তর করা।

গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি নিহিত থাকে জনগণের হাতে। আর সেই শক্তির প্রতীকই হলো ব্যালট, যা নীরব অথচ প্রভাবশালী। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই নীরব শক্তিই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের গতিপথ নির্ধারণ করে।

-সাইমুন