দক্ষিণ এশিয়ায় বেইজিংয়ে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র। এমন পরিস্থিতে চীনকেচেপে ধরতে বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশে পাশে চাইছে ওয়াশিংটন।
ঢাকায় নিযুক্ত ওয়াশিংটনের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেনের বরাত দিয়ে বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ইসলামাবাদের সঙ্গে জিএফ-১৭ যুদ্ধবিমান চুক্তি এবং কক্সবাজারে অংশ নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র জনতার অভুত্থানে ভারত-মিত্র হিসেবে পরিচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন ঘটে। এরপর থেকে তিনি নয়াদিল্লীতে আশ্রয় নিয়েছেন। শেখ হাসিনার পতনের পর এ অঞ্চলে ভারতের উপস্থিতি কমে আসায় বাংলাদেশে চীনের প্রভাব আগের চেয়ে বেড়েছে।
পরবর্তীতে নতুন সরকার গঠনের লক্ষ্যে আগামী বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। চীনের সরঞ্জাম হিসেবে বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশের পরবর্তী সরকারকে মার্কিন এবং মিত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রদানের পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন।
রয়টার্স বলছে, সম্প্রীতি ভারত সীমান্তের কাছে একটি ড্রোন কারখানা নির্মাণের জন্য চীন বাংলাদেশের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। যা বিদেশী কূটনীতিকদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে জিএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কেনার জন্যও আলোচনা করছে। যা ইসলামাবাদ এবং চীনের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি একটি বহুমুখী যুদ্ধবিমান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকায় নিযুক্ত ওয়াশিংটনের রাষ্ট্রদূত বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। চীনের সঙ্গে নির্দিষ্ট সম্পর্কের ঝুঁকি স্পষ্টভাবে জানানোর জন্য বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে তার সামরিক সক্ষমতার চাহিদা পূরণে সহায়তা করার জন্য বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তাব করেছে। মার্কিন সিস্টেম এবং মিত্র অংশীদারদের কাছ থেকে চীনা সিস্টেমের বিকল্প সরবরাহের বিষয়টি রয়েছে।
এদিকে প্রতিবেদনের বিষয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ব্যাপক কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বেইজিং এবং ঢাকা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছে, যা উভয় দেশকেই লাভবান করেছে।
রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, উভয় পক্ষ পারস্পরিকভাবে উপকারী এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা কোনও তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয় এবং কোনও তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ সহ্য করব না।
এ বিষয়ে কূটনীতিক ক্রিস্টেনসেন আরও বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য ঢাকায় ও ভারতের মধ্যে একটি ভালো সম্পর্ক দেখতে চায়। হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে নয়াদিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। যা দুই প্রতিবেশীর মধ্যে কূটনৈতিক, ভিসা পরিষেবা এবং ক্রিকেট নিয়ে সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
ওয়াশিংটনের পরিকল্পনা বিসয়ে মার্কিন কূটনৈতিক বলেন, অনেক মার্কিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে সম্ভাব্য বিনিয়োগের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু তারা চাইবে পরবর্তী সরকারের কাছে ‘ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত’ পরিবেশ দেখতে চায়।
বাণিজ্যিক কূটনীতির শীর্ষ অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে অগ্রগতি, বিশেষ করে বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করার জন্য উন্মুখ।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জ্বালানি উৎপাদনকারী শেভরন কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে রয়েছে। কিন্তু উচ্চ কর এবং মুনাফা ফেরত পাঠানোর অসুবিধা কিছু বাধা তৈরির কারণে অন্য অনেক মার্কিন কোম্পানি দেখা যাচ্ছে না।
রাষ্ট্রদূত বলেন, ওয়াশিংটন বাংলাদেশী জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকারই হোক না কেন তার সঙ্গে কাজ করবে। এদিকে নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল(বিএনপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে দুটি জোটের মধ্যে মতামত জরিপে বিএনপি একটি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য সহায়তা
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর বিষয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, মানবিক কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে। এ বিষয়ে ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে এবং ঢাকায় শক্তিশালী স্বাস্থ্য কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশসহ এই ধরনের সহায়তার কার্যকারিতা উন্নত করার জন্য জাতিসংঘের সঙ্গে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ২ বিলিয়ন ডলারের বিশ্বব্যাপী তহবিল কাঠামোর কথা উল্লেখ করেন তিনি।
একইসাথে তিনি অন্যান্য আন্তর্জাতিক দাতাদের মানবিক সহায়তা কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
মার্কিন কূটনীতিক জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একা এই প্রচেষ্টার সিংহভাগ বহন করতে পারে না। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের রোহিঙ্গাদের সহায়তার জন্য তাদের সহায়তা বৃদ্ধি করা উচিত।
উল্লেখ্য,সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে সহায়তা করার জন্য পর্যাপ্ত তহবিল সংগ্রহ করতে লড়াই করছে। যার ফলে সহায়তা কার্যক্রম সীমিত করাসহ তাদের জন্য কিছু স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
-সাইমুন










