মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হঠাৎ করেই এক চাঞ্চল্যকর পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে কাতারের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে বিশেষ তৎপরতা। দীর্ঘদিনের স্থায়ী অবস্থান থেকে সরিয়ে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাগুলোকে ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের ওপর স্থাপন করা হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরণের পদক্ষেপ সাধারণত উচ্চতর সতর্কতার সংকেত হিসেবে দেখা হয়। এর মাধ্যমে আক্রমণের মুখে নিজেদের সুরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে চাইছে ওয়াশিংটন। সাধারণত এম-৯৮৩ হেভি এক্সপ্যান্ডেড মোবিলিটি টেকটিক্যাল ট্রাকের ওপর এসব ইন্টারসেপ্টর মাউন্ট করার মূল উদ্দেশ্য হলো যেকোনো আকস্মিক হামলার হাত থেকে রক্ষা পেতে দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন বা বিচ্ছুরণ ঘটানো।
স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া এসব দৃশ্য শুধুমাত্র কাতারেই সীমাবদ্ধ নেই বরং জর্ডান, সৌদি আরব, ওমান এবং ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটিতেও মার্কিন সামরিক কার্যক্রমের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। গত জানুয়ারি মাসের তুলনায় ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে আল উদেইদ ঘাঁটিতে নজরদারি বিমান, জ্বালানি সরবরাহকারী ক্যারিয়ার এবং পরিবহন বিমানের সংখ্যা অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ধরনের শক্তিশালী উপস্থিতি নির্দেশ করে মার্কিন বাহিনী কেবল প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানেই নেই, বরং যেকোনো দীর্ঘমেয়াদী লজিস্টিক সহায়তার জন্যও নিজেদের প্রস্তুত রাখছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় প্যাট্রিয়ট সিস্টেম এক অনন্য রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
ইরানের সাথে পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। তেহরানের পক্ষ থেকেও এই পরিস্থিতিতে বেশ কঠোর অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে। ফলে গোটা অঞ্চলের রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সম্প্রতি স্পষ্ট করেছেন, তার দেশ কোনো ধরণের অতিরিক্ত চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে না। যদিও তেহরান আলোচনার পথ খোলা রাখার কথা বলেছে। তবে তাদের অনড় মনোভাব এবং মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এখন এক নাজুক পরিস্থিতির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।
পুরো অঞ্চল যখন উত্তপ্ত, তখন কাতার আবারো তাদের সেই চিরচেনা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে যা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বুধবার কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে উদ্ভূত উত্তেজনা প্রশমন নিয়ে জরুরি আলোচনা করেছেন। একই দিনে দোহার শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সাথে ইরানি প্রতিনিধিদের বৈঠক সরাসরি বার্তা দিচ্ছে, পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক তৎপরতাও সমানতালে সচল রয়েছে। কাতার একই সাথে বিশ্বের বৃহত্তম মার্কিন ঘাঁটির স্বাগতিক দেশ এবং ইরানের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করা রাষ্ট্র হওয়ায় তাদের এই দ্বিমুখী ভূমিকা এখন শান্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা এই পদক্ষেপগুলোকে রুটিনমাফিক নিরাপত্তা মহড়া হিসেবে বর্ণনা করার চেষ্টা করলেও ভূ-রাজনীতিবিদরা একে স্রেফ মহড়া হিসেবে দেখতে নারাজ। তাদের মতে, যখনই মধ্যপ্রাচ্যে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি তৈরি হয়, তখনই প্যাট্রিয়ট সিস্টেমের এই সক্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। এম-১০৪ প্যাট্রিয়ট সিস্টেম মূলত শত্রুপক্ষের লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ এবং নির্ভুলভাবে তা ধ্বংস করতে কার্যকর। মূলত শত্রুর জন্য লক্ষ্যবস্তু খুঁজে পাওয়া কঠিন করে তুলতেই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থাগুলোকে ট্রাকে তুলে গতিশীল রাখা হচ্ছে যাতে তারা সহজে অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জারি করা সতর্কবার্তায় ওমানে অবস্থানরত আমেরিকানদের নিম্নমানের প্রোফাইল বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনে ইরান ছাড়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই সতর্কবার্তাটি আসার পরপরই স্যাটেলাইট ইমেজে সামরিক উপস্থিতির এই নতুন রূপ ফুটে ওঠায় জনমনে যুদ্ধাতঙ্ক আরও প্রবল হয়েছে। তবে অনেক অভিজ্ঞ সামরিক পর্যবেক্ষক মনে করেন, এই ধরণের শক্তিবৃদ্ধি অনেক সময় সরাসরি সংঘাত এড়ানোর একটি কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে বিরত রাখাই হতে পারে পেন্টাগনের বর্তমান রণকৌশল।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় মার্কিন ড্রোন এবং নজরদারি বিমানের বিচরণ অনেক বেড়েছে যা সরাসরি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ইঙ্গিত দেয়। এই অতিরিক্ত নজরদারি মূলত ইরানের সম্ভাব্য গতিবিধি এবং তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর নজর রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সাবধান করে দিয়ে বলেছেন, এই ধরনের তৎপরতা সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা না হলেও এটি অবশ্যই একটি শক্তিশালী সংকেত। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন বোঝাতে চাচ্ছে যে তারা যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং নিজেদের সম্পদ রক্ষায় কোনো ছাড় দেবে না।
-সাইমুন










