নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) বদলে যেতে পারে নির্বাচনী সমীকরণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনে নির্বাচনী উত্তাপ দিন দিন বাড়ছে। মাঠে সক্রিয় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গণসংযোগ, পথসভা, উঠান বৈঠক ও লিফলেট বিতরণে ব্যস্ত সময় পার করেছেন। চায়ের দোকান, হাট-বাজার, পাড়া-মহল্লা—সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রে ভোটের হিসাব-নিকাশ। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রার্থীরা।

এই আসনে ভোটের ভাগ্য নির্ধারণে এবার বড় ভূমিকা রাখতে পারেন আওয়ামীপন্থি ভোটার, তরুণ, সংখ্যালঘু ও নারী ভোটাররা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই চার শ্রেণির ভোটারদের অবস্থানই পাল্টে দিতে পারে নির্বাচনের সমীকরণ।

বিএনপির প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু ধানের শীষ প্রতীকে এবারই প্রথম দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। নির্বাচনের শুরুতে দলীয় কোন্দল থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা অনেকটাই কেটে গেছে। গত ৪ ফেব্রুয়ারি স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ দুলাল হোসেন সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে দিপুকে সমর্থন দেন। পরদিন গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী ওয়াসিম উদ্দিনও ধানের শীষ প্রতীক তুলে দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।

এছাড়া বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত বিজিএমইএ সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী মনিরুজ্জামান প্রকাশ্যে দিপুর পক্ষে মাঠে নামায় দলীয় ঐক্য আরও দৃঢ় হয়েছে। এর পর থেকেই বিএনপির নেতাকর্মীরা ভেদাভেদ ভুলে একাট্টা হয়ে গণসংযোগে নেমেছেন।

স্থানীয়ভাবে দিপু ভূঁইয়া একটি পরিচিত নাম। তার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, শিল্প ও কর্মসংস্থানে ভূমিকা রেখে আসছে। ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত কালীগঞ্জের মসলিন কটন মিলসহ তাদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ১০ হাজারের বেশি শ্রমিক কর্মচারী কর্মরত। পাশাপাশি ভুলতা গাউছিয়া কাপড়ের মার্কেট ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এলাকায় তার পরিবারের অবদান রয়েছে। এসব কারণে ভোটারদের কাছে তিনি একজন পরীক্ষিত ও পরিচিত প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।

অন্যদিকে,নীরব কৌশলে মাঠে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আনোয়ার হোসেন মোল্লা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নীরব কিন্তু ধারাবাহিক জোর প্রচারণা চালিয়ে গেছেন। গ্রাম থেকে গ্রামে, মসজিদে মসজিদে মতবিনিময়, উঠান বৈঠক ও নারীকর্মীদের মাধ্যমে নারী ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে জামায়াত। বিশেষ করে নারী ভোটারদের সক্রিয় করতে তারা আলাদা গুরুত্ব দিয়ছেন, যা তাদের জন্য একটি বাড়তি সুবিধা হয়ে উঠতে পারে।
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোট দিতে না পারা বিপুল সংখ্যক তরুণ ও তরুণী এবার প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ফলে তরুণ ভোটারদের মন জয় করতে প্রার্থীরা ব্যক্তিগত ইমেজ, সততা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর বেশি জোর দিয়ছেন।

দৈনিক আলোকিত স্বদেশ এর সাংবাদিক নজরুল ইসলাম বাদল এর প্রশ্নের জবাবে বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও রাজনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল বলেন,
“নারীদের ঘরে বন্দি না রেখে জাতীয় স্বার্থে সব ক্ষেত্রে সম্পৃক্ত করতে হবে। যিনি নারীদের বাস্তব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারবেন, তিনিই জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রাখেন।”
ভোটকেন্দ্রবিমুখ নারীরাও এবার পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যা ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সংখ্যার হিসাব ও অনিশ্চিত সমীকরণ
রূপগঞ্জ আসনে দুটি পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৮ হাজার ৮২৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৭ হাজার ৮৪৯ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৯৭৭ জন এবং হিজড়া ভোটার ৩ জন। ১২৯টি ভোটকেন্দ্রে ৭৬৩টি ভোটকক্ষ রয়েছে। মোট সাতজন প্রার্থীর মধ্যে দুজন ইতোমধ্যে বিএনপির প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ইনসানিয়াত বাংলাদেশের প্রার্থীরাও সীমিত পরিসরে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে প্রার্থীদের অস্বস্তি। প্রবাসী ও চাকরিজীবীদের পোস্টাল ভোট, সংখ্যালঘু ভোট এবং নতুন ভোটারদের অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে রূপগঞ্জের নির্বাচনী সমীকরণ এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—এবারের নির্বাচনে তরুণ, নারী ও সংখ্যালঘু ভোটাররাই হতে পারেন রূপগঞ্জের রাজনীতির গেমচেঞ্জার।

নজরুল ইসলাম বাদল,রূপগঞ্জ