ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইশতেহারে বাস্তবায়নের রূপরেখা খুব স্পষ্ট নয়। তুলনামূলকভাবে বিএনপির ইশতেহার বেশি গবেষণাভিত্তিক, বিস্তারিত ও পরিমাপযোগ্য। জামায়াতের ইশতেহারে অস্পষ্টতা বেশি।
মঙ্গলবার রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে আয়োজিত গোলটেবিল সংলাপে এসব কথা বলেন বিশিষ্টজনরা।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইশতেহার অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে। নির্বাচনের আগে এগুলো নিয়ে গভীর আলোচনা হয় না এবং নির্বাচনের পর বাস্তবায়ন নিয়ে জবাবদিহিও থাকে না। ইশতেহার কার্যত প্রতিশ্রুতির দলিলে পরিণত হলেও দায়বদ্ধতার দলিল হয়ে ওঠে না।
সংলাপে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিএনপি ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য নিয়েছে। জামায়াত ২০৪০ সালের মধ্যে দুই ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার কথা বলেছে, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত কঠিন। তিনি জানান, এসব লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বার্ষিক ৯-১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দুরূহ। ড. ফাহমিদা আরও বলেন, বিএনপির অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় রাজস্ব ব্যয় ও প্রবৃদ্ধির উৎস নিয়ে তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট ধারণা রয়েছে। তারা মুক্তবাজার অর্থনীতির পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষাকেও গুরুত্ব দিয়েছে। বিপরীতে জামায়াতের লক্ষ্য সুন্দর হলেও তা অর্জনের সুনির্দিষ্ট পথনকশা নেই। বিএনপি প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করতে চায়। জামায়াত পাঁচ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আনতে চায়। কর-জিডিপি অনুপাত বিএনপি ১০ শতাংশে এবং জামায়াত ১৪ শতাংশে নিতে চায়, যা বিশেষজ্ঞদের মতে বাস্তবায়ন কঠিন।
আলোচকরা বলেন, সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে বিএনপি ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালুর মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের কথা বলেছে। জামায়াতের পরিকল্পনাকে ইতিবাচক বলা হলেও তা বাস্তবায়নের কৌশল স্পষ্ট নয় বলে সমালোচনা এসেছে।
পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সায়মা আহমেদ বলেন, বিএনপি রোহিঙ্গা সংকট সমাধান, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। জামায়াতের পররাষ্ট্রনীতি মূলত মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের দিকে বেশি ঝুঁকে আছে এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে স্পষ্ট পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। এ ছাড়া জামায়াত নাগরিকদের সামরিক প্রশিক্ষণের কথা বলেছে, যা অস্পষ্ট ও বিতর্কিত বলে মত দেন আলোচকরা।
গণতন্ত্র ও সংবিধান সংস্কার
ব্রেইনের পরিচালক ড. সফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি ধাপে ধাপে সংবিধান সংস্কার ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার কথা বলেছে। তারা উচ্চকক্ষ গঠনের ক্ষেত্রে নিম্নকক্ষের প্রতিনিধিত্বের অনুপাত বজায় রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত নিম্নকক্ষেও প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (পিআর) পদ্ধতি চালুর কথা বলেছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে মতভেদ রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাত
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডা. তৌফিক জোয়ার্দার বলেন, জামায়াত প্রবীণদের জন্য প্যালিয়েটিভ কেয়ার ও মেডিকেল ট্যুরিজমের কথা বলেছে। বিএনপি বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে জামায়াতের ইশতেহারে পাঁচ বছরের নিচে ও ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে বিনামূল্যে চিকিৎসার কথা বলা হয়েছে, যা অস্পষ্ট। কারণ সরকারি হাসপাতালে এমন সুবিধা ইতোমধ্যে থাকার কথা।
তথ্যপ্রযুক্তি
প্রযুক্তিবিদ জুবায়ের কাজী বলেন, বিএনপি বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোর সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তিকে যুক্ত করে একটি বৃহত্তর ভিশন দিয়েছে এবং পেপাল আনা ও স্টার্টআপ ফান্ড গঠনের কথা বলেছে। জামায়াতের পরিকল্পনা তুলনামূলকভাবে সীমিত, যদিও তারা ২০৩৫ সালের মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলার আইটি রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
পরিবেশ ও জলবায়ু
প্রযুক্তিবিদ সুবাইল বিন আলম বলেন, বিএনপি পরিবেশ রক্ষায় সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য দিয়েছে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার, কার্বন ক্রেডিট থেকে আয়। জামায়াতের পরিবেশ পরিকল্পনা তুলনামূলকভাবে কম বিস্তারিত ও অস্পষ্ট।
-সাইমুন










