অপরাধ দমনে ব্যর্থতায় ক্ষুব্ধ ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকরা

ইসরায়েলের ভেতরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি নাগরিকরা ভয়াবহ অপরাধ প্রবণতা ও দীর্ঘদিনের সরকারি অবহেলার বিরুদ্ধে ক্রমেই চরম অসন্তোষের দিকে এগোচ্ছেন। উত্তর ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি-অধ্যুষিত শহর ও গ্রামগুলোতে সংগঠিত অপরাধ, চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ড নিত্যদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। জানুয়ারির এক সোমবার সকালে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবছিলেন সাখনিন শহরের প্রবীণ দোকানদার আলি জুবেইদাত। বহু বছর ধরে ব্যবসা চালিয়ে আসা এই ব্যক্তি সেদিন বুঝে যান-আর নয়। সেদিন তার মোবাইলে পাঠানো একটি বার্তায় লেখা ছিল, “তুমি কোথায় যাও, কী কর-সব আমরা জানি। আমাদের বলা কাজ শেষ না করলে তোমাকে হত্যা করা হবে।” খবর আলজাজিরার।

এর আগেও চারবার তার পরিবারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়েছিল। সর্বশেষ হামলায়, মাত্র এক সপ্তাহ আগে, তার একটি দোকানে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল থেকে ডজনখানেক গুলি ছোড়া হয়। এই হুমকিই শেষ পর্যন্ত তাকে সব ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য করে। পুনরায় খোলার কোনো পরিকল্পনাও নেই তার। জুবেইদাতের এই সিদ্ধান্ত দ্রুত সাখনিন ছাড়িয়ে ইসরায়েলের অন্যান্য ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত এলাকাতেও আলোড়ন তোলে। তার প্রতিবাদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে শহরের আরও বহু দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। সাখনিনে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুত জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি ও ইহুদি ইসরায়েলি একসঙ্গে তেল আবিবের রাস্তায় নামেন। জেরুজালেমে বিক্ষোভকারীরা যান চলাচল কার্যত অচল করে দেন।

ইসরায়েলের পার্লামেন্টের ফিলিস্তিনি সদস্য আইদা তৌমা-সুলেইমান বলেন, ২০২৫ সালে ইসরায়েলে ২৫২ জন ফিলিস্তিনি খুন হয়েছেন। তবে এই সংখ্যা পুরো বাস্তবতা তুলে ধরে না। তার ভাষায়, এটি সেই হাজারো মানুষের কথা বলে না, যারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না, কিংবা যারা আয়ের প্রায় সবটাই অপরাধচক্রকে চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি বলেন, ভয় ও ক্ষোভ বহুদিন ধরে জমছিল, কিন্তু সাখনিনের এক সাহসী মানুষের সিদ্ধান্তই এই প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে।

ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশই ফিলিস্তিনি নাগরিক। তারা ১৯৪৮ সালের নাকবার সময় বাস্তুচ্যুত না হওয়া ফিলিস্তিনিদের বংশধর। এই জনগোষ্ঠীর বড় অংশ আলাদা শহর ও গ্রামে বসবাস করে, যেখানে সরকারি বিনিয়োগ সীমিত এবং তারা কার্যত দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে জীবনযাপন করেন। আরব মানবাধিকার সংগঠন আদালাহ’র প্রতিষ্ঠাতা হাসান জাবারিন বলেন, এখানে রাষ্ট্র সক্রিয়ভাবে শত্রুতা করছে এমন নয়, বরং রাষ্ট্র প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। তিনি পরিস্থিতিকে দার্শনিক টমাস হবসের বর্ণনার সঙ্গে তুলনা করে বলেন, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ছাড়া জীবন হয়ে উঠেছে নিষ্ঠুর, বিপজ্জনক ও সংক্ষিপ্ত।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের প্রায় ৩৮ শতাংশ ফিলিস্তিনি পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। প্রায় অর্ধেক পরিবার মাস শেষে আয় দিয়ে খরচ চালাতে পারে না। ২০২৩ সালে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিম তীরে যাতায়াত সীমিত হওয়ায় কর্মসংস্থান পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বর্তমানে মাত্র ৫৪ শতাংশ ফিলিস্তিনি পুরুষ এবং ৩৬ শতাংশ ফিলিস্তিনি নারী কর্মরত। এই দারিদ্র্য, বঞ্চনা ও রাষ্ট্রীয় অনুপস্থিতিই সংগঠিত অপরাধের জন্য উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছে। তৌমা-সুলেইমান বলেন, নাকবা থেকে আজ পর্যন্ত ফিলিস্তিনি শহর ও গ্রামগুলোতে পর্যাপ্ত পুলিশ স্টেশন নেই। অপরাধীরা জানে, তাদের থামানোর কেউ নেই।

তার দাবি, কিছু অপরাধচক্র এমন পরিবার দ্বারা পরিচালিত, যাদের ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। ফলে পুলিশও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে না। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও শিন বেতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। বর্তমানে এসব অপরাধচক্র মাফিয়া-ধাঁচের কাঠামো গড়ে তুলেছে। তারা নিজস্ব ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালায়, সুদে ঋণ দেয়, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের নেতৃত্বাধীন পুলিশ বাহিনী এসব অপরাধ দমনে ব্যর্থ বলে অভিযোগ রয়েছে। বেন-গভির নিজেও অতীতে ফিলিস্তিনবিরোধী উগ্র গোষ্ঠী সমর্থনের অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন।

সমাজবিজ্ঞানী ইয়েহুদা শেনহাভ-শাহরাবানি বলেন, অনেক ইহুদি ইসরায়েলি এটিকে ‘আরব সমস্যা’ বলে আখ্যা দেন এবং রাষ্ট্রের দায় এড়িয়ে যান। বাস্তবে রাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবেই এসব এলাকাকে অবহেলা করছে। এক ইহুদি ও এক ফিলিস্তিনি শিশুর ভবিষ্যৎ তুলনা করে হাসান জাবারিন বলেন, এক শিশু নিশ্চিন্তে ঘুমাবে এবং নিরাপদে স্কুলে যাবে। অন্য শিশুটি বন্দুকের শব্দে ঘুমাতে পারবে না। স্কুলে যাওয়ার পথে বা চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সময়ও তাকে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভয় নিয়ে বড় হতে হবে। এই পরিস্থিতি বদলাতে কার্যকর আইনশৃঙ্খলা, রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি ও সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে এখন রাস্তায় নেমেছে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকরা।

-বেলাল হোসেন