পুরান ঢাকার বাখরখানি শুধু একটি খাবার নয়, এটি এক ধরনের ঐতিহ্য, স্মৃতি আর ইতিহাসের অংশ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই বিশেষ রুটি পুরান ঢাকার খাদ্যসংস্কৃতিকে আলাদা পরিচয় দিয়ে আসছে। শক্ত, খাস্তা আর স্তরযুক্ত এই বাখরখানি যেমন স্বাদে অনন্য, তেমনি এর পেছনের গল্পও সমান সমৃদ্ধ।
বাখরখানির উৎপত্তি নিয়ে নানা কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। কেউ বলেন, মুঘল আমলেই এর সূচনা, আবার কারও মতে নবাবি রান্নাঘরের প্রভাবেই এর জনপ্রিয়তা বাড়ে। একসময় নবাবদের প্রাতরাশ বা বিশেষ আপ্যায়নে বাখরখানি ছিল অত্যন্ত মর্যাদার খাবার। ধীরে ধীরে তা সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরান ঢাকার অলিগলিতে নিজস্ব জায়গা করে নেয়।
পুরান ঢাকার বাখরখানি তৈরির প্রক্রিয়া বেশ সময়সাপেক্ষ ও শ্রমনির্ভর। ময়দা, ঘি, দুধ, চিনি ও সামান্য লবণ দিয়ে খামির তৈরি করা হয়। এরপর খামিরকে বারবার বেলে, ভাঁজ করে স্তর তৈরি করা হয়। এই স্তরই বাখরখানির আসল বৈশিষ্ট্য। অনেক ক্ষেত্রে উপরে দুধ, চিনি বা ঘি মাখিয়ে তিল কিংবা খসখস ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর ধীরে আঁচে বেক বা তাওয়ায় সেঁকে নেওয়া হয়, যাতে ভেতরটা শক্ত হলেও বাইরের অংশ হয় ঝরঝরে ও খাস্তা।
পুরান ঢাকার বাখরখানির স্বাদ অন্য এলাকার বাখরখানি থেকে আলাদা। এখানে চিনি ব্যবহার করা হলেও তা খুব বেশি মিষ্টি নয়, বরং হালকা মিষ্টি আর ঘিয়ের সুবাসে ভরপুর। সাধারণত সকালে নাশতায় বা বিকেলের আড্ডায় চা কিংবা দুধের সঙ্গে বাখরখানি খাওয়ার চল রয়েছে। অনেক পরিবার আবার এটি অতিথি আপ্যায়নের জন্য সংরক্ষণ করে রাখে, কারণ দীর্ঘদিন ভালো থাকে বাখরখানি।
আজও পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, চাঁদনি চক বা ইসলামপুর এলাকায় পুরোনো ধাঁচে বাখরখানি বানানো হয়। আধুনিক বেকারির নানা খাবারের ভিড়েও বাখরখানি তার জায়গা হারায়নি। বরং ঐতিহ্যপ্রেমী মানুষ ও নতুন প্রজন্মের কৌতূহলের কারণে এর কদর আবারও বাড়ছে।
-বিথী রানী মণ্ডল










