গ্রিনল্যান্ডে প্রথমবারের মতো কূটনৈতিক মিশন খুলতে যাচ্ছে কানাডা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকির প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপকে দেশটির প্রতি কানাডার সংহতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। খবর বিবিসির।
কানাডার গভর্নর জেনারেল মেরি সাইমন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দসহ শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের একটি প্রতিনিধি দল শুক্রবার গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুকে পৌঁছাবেন। তাদের সফরের সময় একটি কানাডীয় কোস্ট গার্ড জাহাজও সেখানে উপস্থিত থাকবে। সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো আনুষ্ঠানিকভাবে কানাডার নতুন কনস্যুলেট উদ্বোধন করা। সফরের আগে দেওয়া এক ভাষণে গভর্নর জেনারেল মেরি সাইমন বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ডের জনগণ তাদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করবেন-এ বিষয়ে কানাডা দৃঢ়ভাবে তাদের পাশে রয়েছে।’
একই দিনে ফ্রান্সও গ্রিনল্যান্ডে তাদের কনস্যুলেট উদ্বোধন করতে যাচ্ছে। কানাডা ও ফ্রান্সের এই উদ্যোগকে গ্রিনল্যান্ডে বিদেশি কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চলতি সপ্তাহের আগে নুকে কেবল আইসল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক উপস্থিতি ছিল। এই উদ্যোগ ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর পক্ষ থেকে গ্রিনল্যান্ডের প্রতি সমর্থনের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিতও দিচ্ছে। ট্রাম্প একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছিলেন। পরে তিনি সেই অবস্থান কিছুটা নমনীয় করে জানান, ডেনমার্ক, ইউরোপীয় মিত্র ও কানাডার সঙ্গে আলোচনার পর সম্ভাব্য একটি চুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
গ্রিনল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরেই কানাডার কৌশলগত আগ্রহের তালিকায় রয়েছে। ২০২৪ সালের শুরুতে কানাডা তাদের আর্কটিক পররাষ্ট্রনীতি পর্যালোচনার সময় এই কনস্যুলেট স্থাপনের ঘোষণা দেয়। যদিও ২০২৫ সালের শেষ দিকে উদ্বোধনের কথা থাকলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তা পিছিয়ে যায়। ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও আর্কটিক বিশেষজ্ঞ মাইকেল মায়ার্স বলেন, গ্রিনল্যান্ড ও আর্কটিক কানাডার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিবেচনায় নিলে এই কনস্যুলেট আরও আগেই হওয়া উচিত ছিল। তিনি উল্লেখ করেন, কানাডার নুনাভুট অঞ্চলের রাজধানী ইকালুইট থেকে নুক মাত্র এক ঘণ্টার ফ্লাইট দূরে। এছাড়া কানাডীয় ইনুইট ও গ্রিনল্যান্ডের ইনুইট জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে গভীর সাংস্কৃতিক ও জাতিগত সম্পর্ক।
গভর্নর জেনারেল মেরি সাইমন নিজেও ইনুইট বংশোদ্ভূত। তিনি জানান, শৈশবে তার দাদির শর্টওয়েভ রেডিওতে গ্রিনল্যান্ডের ইনুইটদের গান শুনে তিনি এই ভূখণ্ডের সঙ্গে পরিচিত হন। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই এক জনগোষ্ঠী-এই কথাই তখন শুনতাম।’ ১৯৮২ সালের পর এই প্রথম কোনো কানাডীয় গভর্নর জেনারেল গ্রিনল্যান্ড সফরে গেলেন। ইনুইট টাপিরিত কানাটামির সভাপতি নাতান ওবেদ জানান, বহু বছর ধরে কানাডীয় ইনুইটদের পক্ষ থেকে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার যে দাবি ছিল, এই কনস্যুলেট তারই ফল। তিনি বলেন, মন্ট্রিয়াল থেকে একটি চার্টার্ড বিমানে প্রায় ৫০ জন কানাডীয় ইনুইট নুকে যাচ্ছেন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নিতে।
গ্রিনল্যান্ডের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি কানাডীয় ইনুইটদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে বলে জানান ওবেদ। তিনি বলেন, গ্রিনল্যান্ড ও কানাডা উভয়েরই উপনিবেশিক ইতিহাস রয়েছে এবং ট্রাম্পের মন্তব্য সেই পুরোনো আশঙ্কাগুলোকে উসকে দিয়েছে। এদিকে কানাডার সরকার আর্কটিক অঞ্চলকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে ঘোষণা করেছে। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সরকার আর্কটিকে বছরব্যাপী সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নে এক বিলিয়ন কানাডীয় ডলারের বেশি বরাদ্দ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ বলেন, আর্কটিক প্রতিরক্ষা এই সরকারের জন্য কোনো গৌণ বিষয় নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু।
দূতাবাস উদ্বোধনের পাশাপাশি গভর্নর জেনারেল সাইমন গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনন্দ বৈঠক করবেন গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মোৎজফেল্টের সঙ্গে।
-বেলাল হোসেন










