মার্কিন অর্থলগ্নিকার জেফ্রি এপস্টাইন–সংক্রান্ত তদন্তের সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার নথি ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (ডিওজে)। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রকাশিত নথিতে ত্রুটিপূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষার কারণে তাঁদের পরিচয় ফাঁস হয়ে গেছে।
এপস্টিনের ভুক্তভোগীদের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, গত শুক্রবার প্রকাশিত নথিগুলোর ত্রুটিপূর্ণ সম্পাদনা (রিড্যাকশন) প্রায় ১০০ জন বেঁচে যাওয়া ভুক্তভোগীর জীবন ‘উলটপালট করে দিয়েছে’। ডিওজে এক বিবৃতিতে জানায়, যেসব নথিতে সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং এই ভুল ‘প্রযুক্তিগত বা মানবিক ত্রুটি’র কারণে হয়েছে।
এ বিষয়ে বুধবার নিউইয়র্কে যে আদালত শুনানি হওয়ার কথা ছিল, তা বাতিল করা হয়েছে। বিচারক জানান, ভুক্তভোগী পক্ষ ও বিচার বিভাগ গোপনীয়তা–সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে পৌঁছাতে পেরেছে। শুক্রবার প্রকাশিত নথিগুলোর মধ্যে ই–মেইল ঠিকানা ও নগ্ন ছবি ছিল, যেখানে নাম ও মুখের মাধ্যমে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছিল।
ভুক্তভোগীরা এক বিবৃতিতে এই প্রকাশকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দেন এবং বলেন, তাঁদের ‘নাম প্রকাশ, যাচাই–বাছাই কিংবা পুনরায় মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত’ করা উচিত নয়। সোমবার ফেডারেল বিচারক রিচার্ড বারম্যানের কাছে জমা দেওয়া এক চিঠিতে ডিওজে জানায়, “গতকাল সন্ধ্যার মধ্যে ভুক্তভোগী বা তাঁদের আইনজীবীরা যেসব নথি অপসারণের অনুরোধ করেছেন, সেগুলো অতিরিক্ত সম্পাদনার জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।”
বিচার বিভাগ আরও জানায়, নতুন অনুরোধগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং অন্য কোনো নথিতে অতিরিক্ত সম্পাদনার প্রয়োজন আছে কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্বাধীনভাবে শনাক্ত করা ‘উল্লেখযোগ্য সংখ্যক’ নথিও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরে এপস্টাইনের ভুক্তভোগীদের আইনজীবীরা বিচারক বারম্যানকে জানান, ডিওজের সঙ্গে ‘বিস্তৃত ও গঠনমূলক আলোচনা’ হয়েছে এবং তাঁরা আশা করছেন দ্রুততার সঙ্গে ত্রুটিগুলো সংশোধন করা হবে, যাতে ভুক্তভোগীরা আর কোনো ক্ষতির মুখে না পড়েন।
জবাবে বিচারক লেখেন, গোপনীয়তা–সংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধান হওয়ায় তিনি ‘খুশি হলেও বিস্মিত নন’। শুক্রবার নথি প্রকাশের শর্ত অনুযায়ী-যা কংগ্রেসের উভয় কক্ষ অনুমোদিত একটি আইনের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল-ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করতে পারে এমন সব তথ্য গোপন রাখার কথা ছিল ফেডারেল সরকারের।
এর পরপরই ভুক্তভোগীদের আইনজীবীরা নিউইয়র্কের আদালতে ডিওজের ওয়েবসাইট থেকে নথিগুলো সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ চেয়ে আবেদন করেন। তাঁরা একে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ‘এক দিনে সংঘটিত ভুক্তভোগীর গোপনীয়তার সবচেয়ে ভয়াবহ লঙ্ঘন’ বলে বর্ণনা করেন।
আইনজীবী ব্রিটানি হেন্ডারসন ও ব্র্যাড এডওয়ার্ডস বলেন, হাজার হাজার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের নাম ও ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় এটি একটি ‘চলমান জরুরি পরিস্থিতি’, যার জন্য তাৎক্ষণিক বিচারিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। ভুক্তভোগীদের কয়েকজন ওই চিঠিতে ব্যক্তিগত মন্তব্যও যোগ করেন। তাঁদের একজন বলেন, এই প্রকাশ তাঁর জীবনের জন্য ‘হুমকিস্বরূপ’, আরেকজন জানান, তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাংকিং তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর তিনি মৃত্যুহুমকি পেয়েছেন।
মঙ্গলবার বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এপস্টাইনের ভুক্তভোগী অ্যানি ফার্মার বলেন, “নতুন যেসব তথ্য প্রকাশ পেয়েছে, সেগুলোর দিকে মন দেওয়া কঠিন-কারণ বিচার বিভাগ যেভাবে ভুক্তভোগীদের প্রকাশ করেছে, তাতে যে ক্ষতি হয়েছে তা ভয়াবহ।”আরেক ভুক্তভোগী লিসা ফিলিপস বলেন, অনেকেই প্রকাশিত নথির ফলাফলে ‘ভীষণভাবে অসন্তুষ্ট’। তিনি বিবিসির নিউজডে অনুষ্ঠানে বলেন, “বিচার বিভাগ আমাদের তিনটি শর্তই লঙ্ঘন করেছে। এক-অনেক নথি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। দুই-প্রকাশের নির্ধারিত সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। তিন-অনেক ভুক্তভোগীর নাম প্রকাশ করে দেওয়া হয়েছে।”তিনি আরও বলেন, “আমাদের সঙ্গে যেন খেলাধুলা করা হচ্ছে। কিন্তু আমরা লড়াই থামাব না।”
নারী অধিকারকর্মী ও আইনজীবী গ্লোরিয়া অলরেড, যিনি এপস্টাইনের বহু ভুক্তভোগীর পক্ষে মামলা করেছেন, এর আগে বিবিসিকে বলেন-সর্বশেষ নথি প্রকাশে এমন অনেক ভুক্তভোগীর নাম প্রকাশ হয়েছে, যাঁরা আগে কখনো প্রকাশ্যে পরিচিত ছিলেন না। তিনি বলেন, “কিছু ক্ষেত্রে নামের ওপর দাগ টানা হলেও নাম স্পষ্টভাবে পড়া যাচ্ছে। আবার কোথাও এমন ভুক্তভোগীদের ছবি প্রকাশ করা হয়েছে, যাঁরা কখনো প্রকাশ্যে কথা বলেননি বা নিজেদের নাম জানাননি।”
ডিওজের এক মুখপাত্র বিবিসির যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদ সহযোগী সিবিএসকে বলেন, বিচার বিভাগ ‘ভুক্তভোগীদের সুরক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়’ এবং লাখো পাতার নথির মধ্যে হাজার হাজার ভুক্তভোগীর নাম গোপন রাখা হয়েছে। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত প্রকাশিত নথির মাত্র ‘০.১ শতাংশ’ পাতায় এমন তথ্য পাওয়া গেছে, যা দিয়ে ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করা সম্ভব। গত বছর একটি আইনের মাধ্যমে এপস্টাইন–সংক্রান্ত নথি প্রকাশ বাধ্যতামূলক হওয়ার পর থেকে ডিওজে ইতিমধ্যে লাখো নথি প্রকাশ করেছে। সর্বশেষ দফায় প্রকাশিত হয়েছে ৩০ লাখ পৃষ্ঠা, ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি ও ২ হাজার ভিডিও।
উল্লেখ্য, দ্বিদলীয় কংগ্রেসের চাপে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বাক্ষরিত আইনে নির্ধারিত সময়সীমা ছয় সপ্তাহ অতিক্রম করার পর এই নথিগুলো প্রকাশ করা হয়। যৌন পাচারের অভিযোগে বিচারাধীন অবস্থায় ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট নিউইয়র্কের একটি কারাগারে জেফ্রি এপস্টাইনের মৃত্যু হয়।
-বেলাল










