ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনায় রাশিয়ার হামলা ‘বিশেষভাবে নৃশংস’: ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার

ছবিঃ সংগৃহীত

ইউক্রেনে তীব্র শীতের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোতে রাশিয়ার হামলাকে ‘বর্বর’ ও ‘বিশেষভাবে নৃশংস’ বলে আখ্যা দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার।

সোমবার গভীর রাতে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় রাশিয়া হামলা চালানোর পর তিনি এই মন্তব্য করেন। ওই সময় ইউক্রেনে তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।

হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন স্টারমার। উল্লেখ্য, তীব্র শৈত্যপ্রবাহের কারণে ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে এক সপ্তাহের জন্য হামলা বন্ধ রাখতে অনুরোধ করেছিলেন। সেই বিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরই নতুন করে হামলা চালায় রাশিয়া। ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, পুতিন তার ‘কথা রেখেছেন’ এবং তিনি চান যুদ্ধের অবসান হোক। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দূতরা শান্তি পরিকল্পনার বিস্তারিত নিয়ে আলোচনার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে ইউক্রেন ও রাশিয়ার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করছেন।

রাশিয়ার নতুন হামলা নিয়ে হতাশ কি না-এমন প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, “চুক্তিটা ছিল রোববার থেকে রোববার পর্যন্ত। তিনি (পুতিন) সেটা মেনেছেন। এক সপ্তাহও অনেক কিছু-বিশেষ করে যখন ওখানে ভয়ংকর ঠান্ডা।” যুদ্ধ অবসানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দিলেও এখনো যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হননি রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন। রাশিয়ার সর্বশেষ হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কিয়েভে এক হাজারের বেশি বহুতল ভবন এখনো গরম ও বিদ্যুৎবিহীন। পূর্বাঞ্চলীয় শহর খারকিভের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি অচল হয়ে গেছে।

চরম ঠান্ডা থেকে বাঁচতে অনেক বাসিন্দাকে মেট্রো স্টেশনে রাত কাটাতে হচ্ছে। কেউ কেউ প্ল্যাটফর্মে তাঁবু খাটিয়েছেন। কিয়েভ জুড়ে উষ্ণতা কেন্দ্র স্থাপন করেছে কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘ সময়ের বিদ্যুৎ বিভ্রাট মোকাবিলায় আরও জেনারেটর আমদানি করা হচ্ছে, যদিও ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো মেরামতে সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন প্রকৌশলীরা।

ইউক্রেনের জ্বালানিমন্ত্রী দেনিস শ্মিহাল বলেছেন, দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার পরিস্থিতি এখনো ‘কঠিন’। কিয়েভের দারনিতসিয়া যৌথ তাপ ও বিদ্যুৎকেন্দ্র (সিএইচপি) মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও তিনি জানান। কিয়েভের বাসিন্দা মনোবিজ্ঞানী ইরিনা ভোভক তাঁর মেয়েকে নিয়ে শহরেই থাকেন। তাঁর স্বামী বর্তমানে যুদ্ধে আছেন। বিবিসি রেডিও ফোরের টুডে অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও পানির সংকটের কারণে তিনি হয়তো বাবা-মায়ের গ্রামে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন। “কিয়েভে জীবন এখন খুবই ভয়াবহ,” বলেন তিনি। মেয়ের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে ভোভক বলেন, “ও মোটামুটি ঠিক আছে। হাসার চেষ্টা করে, স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে চায়। কিন্তু এটা কোনো স্বাভাবিক জীবন নয়। সে ঠিকভাবে পড়াশোনা করতে পারে না, অনলাইন ক্লাসও নিতে পারে না।”

ইউক্রেন বারবার ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতির কথা জানিয়ে মিত্র দেশগুলোর কাছে আরও সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে। ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনী জানিয়েছে, বুধবার ভোরে ১০০টিরও বেশি ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়। অধিকাংশ ড্রোন ভূপাতিত করা গেলেও ১৪টি স্থানে হামলার খবর পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও ধ্বংসাবশেষ পড়েও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

ডিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলের সামরিক প্রশাসনের প্রধান ওলেক্সান্দ্র গাঞ্জা জানান, রুশ হামলায় ৬৮ বছর বয়সী এক নারী ও ৩৮ বছর বয়সী এক পুরুষ নিহত হয়েছেন। আরও দুজন আহত হয়েছেন। জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের প্রধান ইভান ফেদোরভ বলেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে রাতভর চলা হামলায় তিনজন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে।

অন্যদিকে রুশ-নিয়ন্ত্রিত লুহানস্ক প্রশাসন জানিয়েছে, ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় একটি মিনিবাসে আঘাত লেগে এক নারী ও এক পুরুষ নিহত হয়েছেন। ওডেসায় আবাসিক ভবনে হামলার ঘটনায় অন্তত একজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।“আমি ঘুমাতে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখনই এটা ঘটে। আমার অ্যাপার্টমেন্ট পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। কিছুই অবশিষ্ট নেই,” ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমকে বলেন স্থানীয় বাসিন্দা ওলেনা।

এদিকে রাশিয়ার ব্রায়ানস্ক অঞ্চলের গভর্নর আলেক্সান্দার বোগোমাজ বলেন, ইউক্রেন ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ‘সমন্বিত হামলা’ চালিয়েছে। এতে একটি আবাসিক ভবন ধ্বংস হয় এবং একজন আহত হন। রাশিয়ার সীমান্তবর্তী বেলগোরোদ অঞ্চলেও ইউক্রেনীয় হামলার পর বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন গভর্নর ভিয়াচেসলাভ গ্লাদকভ। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার (ট্রাম্পের জামাতা) আবুধাবিতে ইউক্রেন ও রাশিয়ার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন। আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনার নানা দিক নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

সবচেয়ে জটিল বিষয়টি হলো-ডনবাস শিল্পাঞ্চলের যে অংশ এখনো রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে নেই, সেগুলো ইউক্রেনকে ছেড়ে দিতে মস্কোর দাবি। সাম্প্রতিক সময়ে ওই অঞ্চলে ধীরগতিতে অগ্রসর হয়েছে রুশ বাহিনী।উল্লেখ্য, রাশিয়া ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসন শুরু করে।

-বেলাল