টিআইবি বাস্তব সংস্কার কার্যক্রম দেখতে ব্যর্থ হয়েছে: অর্থ উপদেষ্টা

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্বর্তী সরকারের বাস্তব সংস্কার কার্যক্রম দেখতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, টিআইবির লোকজন চোখে সবকিছু দেখতে পারে না। ওদের তো দিব্য দৃষ্টি নেই, ভালো দৃষ্টিও নেই। দেখতে চাইলেও অনেক কিছু তারা দেখতে পারে না।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি এসব কথা বলেন।

সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, আগের দিন টিআইবি দাবি করেছে- এই সরকার যতটা দৃশ্যমান দেখাচ্ছে, বাস্তবে উন্নয়ন বা সংস্কার ততটা হয়নি। এর জবাবে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, টিআইবি শুধু আইনকানুনের দিকটাই দেখে। অথচ আমরা অনেক প্রক্রিয়া সহজ করেছি, যেগুলো তারা দেখছে না। আগে বিদেশি মজুরি প্রকল্পে অনুমতি নিতে হতো, এখন সেটি সহজ করা হয়েছে। আমরা বলছি না সব স্বয়ংক্রিয় হয়েছে, কিন্তু অনেক কিছুই সহজ করা হয়েছে। এসব তারা কেন দেখছে না- সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

এক সাংবাদিক বলেন, আপনি তো আগে টিআইবির প্রশংসা করতেন, ক্ষমতায় গেলে সবাই টিআইবিকে বাঁকা চোখে দেখে। এর জবাবে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, তিনি এখনও টিআইবির বদনাম করছেন না। তবে যেগুলো মৌলিক বিষয়, সেগুলোর দিকে নজর দেওয়ার কথা বলছেন।

তিনি বলেন, কেউ যদি না দেখার ইচ্ছা করে, তাহলে অনেক কিছুই উপেক্ষা করা যায়। নিজেকে উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, তাকে কখনও বাইরে বসে অযথা সমালোচনা করতে দেখা যায়নি; তিনি সব সময় মূল বিষয়গুলো নিয়েই কথা বলেছেন।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সংস্কার কমিশনের সদস্য ছিলেন- এ কথা উল্লেখ করে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, মানুষের প্রত্যাশা অবশ্যই থাকে। সরকারও ভেবেছিল ধাপে ধাপে সংস্কার এগিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু সংস্কার করতে গেলে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। ভেতরে গিয়ে তিনি দেখেছেন, প্রক্রিয়ায় এত গলদ যে তা কল্পনাও করা যায় না। তারপরও অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনেক কাজ তিনি করে দিয়েছেন বলে দাবি করেন। অর্থ সচিবসহ সংশ্লিষ্টরা দ্রুত কাজ করছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। অন্য অনেক উপদেষ্টার মধ্যেই হতাশা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, তিনি সিভিল সার্ভিস থেকে এসেছেন এবং প্রশিক্ষিত। কীভাবে কী করতে হয়, তা তিনি জানেন। কিন্তু সবার তো সেই অভিজ্ঞতা নেই। সহযোগিতা না পেলে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের মতো দেশে কাজ করা সত্যিই কঠিন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে প্রক্রিয়াগুলো অত্যন্ত জটিল, নানা ধরনের হস্তক্ষেপ রয়েছে, যা জট ছাড়ানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি করে।

এটি কি আমলাতান্ত্রিক সমস্যা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অবশ্যই আমলাতান্ত্রিক একটি অংশ রয়েছে। পাশাপাশি যারা আইন তৈরি করেছে, তারাও অনেক ক্ষেত্রে আইন ভালোভাবে করেনি। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, তার সময়ে ব্যাংকে এক পরিবার থেকে দুই বা তিনজন পরিচালক থাকতেন। পরবর্তী সময়ে এসে সেটি বাড়িয়ে ছয়জন করা হয়েছে, যা আসলে পেছনের দিকে যাওয়ার মতো সিদ্ধান্ত।

দেড় বছর দায়িত্ব পালন শেষে দেশের অর্থনীতিকে কোন অবস্থায় রেখে যাচ্ছেন- এমন প্রশ্নে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, তিনি মনে করেন অর্থনীতি এখন একটি সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে। সামনে যে সরকার আসবে, তাদের খুব বেশি সমস্যায় পড়তে হবে না।

এই সরকার সর্বোচ্চ ঋণ করেছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সর্বোচ্চ ঋণ যেমন নেওয়া হয়েছে, তেমনি সর্বোচ্চ ঋণ শোধও করা হয়েছে। ছয় বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ঋণ শোধের দায়িত্ব তার হলেও এর সুফল ভবিষ্যৎ সরকার পাবে।

উন্নয়ন আগের মতো হয়নি- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, উন্নয়ন কাজ থেমে গেছে, কারণ আগের মতো অপ্রয়োজনীয় ও ব্যয়বহুল প্রকল্প আর নেওয়া হয়নি। উদাহরণ হিসেবে কর্ণফুলী টানেলের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

তাহলে এত ঋণ নিতে হলো কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগের সময় নেওয়া দায়বদ্ধতা সরকার বাতিল করেনি বলেই ঋণ নিতে হয়েছে।

অর্থনীতি সন্তোষজনক হলেও বেকারত্ব বেড়েছে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি বড় চ্যালেঞ্জ। ছোট ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানো দরকার ছিল, কিন্তু সে জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ছিল না। বাংলাদেশ ব্যাংক চেষ্টা করেছে, তবে বড় কারখানাগুলোতে শ্রমনির্ভরতা তুলনামূলক কম বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সবশেষে অর্থনীতি সন্তোষজনক বলা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি বলেন, সন্তোষজনক বলতে তিনি স্থিতিশীল অবস্থার কথা বোঝাচ্ছেন। অর্থনীতি আগের মতো নড়বড়ে অবস্থায় নেই, ভবিষ্যৎ সরকার এটিকে সামনে এগিয়ে নিতে পারবে।

-সাইমুন