অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর হচ্ছে ইইউ

অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর অবস্থান নিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।  অনিয়মিত পথে ইউরোপে প্রবেশ করা অভিবাসীদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোকে ‘জরুরি অগ্রাধিকার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ইউরোপীয় কমিশন (ইসি)।  কমিশনের স্পষ্ট বক্তব্য ইউরোপে কে বা কারা আসবে, সে সিদ্ধান্ত ইউরোপই নেবে।

ইউরোপীয় কমিশন জোটের অভিবাসন ও আশ্রয় নীতি নিয়ে একটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে। এই পরিকল্পনায় অনিয়মিত অভিবাসন মোকাবিলার পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

ইইউর অভিবাসন কমিশনার মাগনুস ব্রুনার বলেন, অগ্রাধিকার একেবারেই স্পষ্ট, অনিয়মিত আগমনের সংখ্যা কমিয়ে আনা এবং তা নিয়ন্ত্রণে রাখা। তিনি বলেন, অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহারের কারণে এ বিষয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে, যা জনগণের আস্থাকে দুর্বল করছে। একই সঙ্গে এতে আশ্রয় দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং দক্ষ জনশক্তিকে আকৃষ্ট করার প্রচেষ্টাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ইইউর ওপর রাজনৈতিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে এই প্রেক্ষাপটেই নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইইউজুড়ে অনিয়মিত আগমন আগের বছরের তুলনায় অন্তত ২৫ শতাংশ কমেছে।

এই পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে ২৭ সদস্যের জোট অভিবাসন ও আশ্রয় নীতিতে ‘একটি নতুন অধ্যায়’ শুরু করতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্রুনার।

তবে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইইউর এই পরিকল্পনার কড়া সমালোচনা করেছে। সংস্থাটির মতে, অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে তথাকথিত ‘তৃতীয় দেশগুলোর’ ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ইইউকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলতে পারে।

পরিকল্পনা উপস্থাপনের সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও গণতন্ত্র বিষয়ক নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট হেন্না ভিরকুনেন বলেন, অনিয়মিত আগমন কমে আসার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা ধরে রাখতে হবে। পাশাপাশি আইনি পথে ইউরোপে প্রবেশের সুযোগ আরও বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি। তার মতে, এই দুটি বিষয় ছাড়া অভিবাসন কাঠামো কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয় এবং এতে সমাজ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হয়।

ইউরোপ ঠিক করবে, কারা আসবেন

অভিবাসন নীতি নিয়ে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইউরোপীয় কমিশন জানিয়েছে, তারা একটি ‘ন্যায্য ও দৃঢ় কাঠামো’ গড়ে তুলতে চায়। এতে বলা হয়েছে, এই নীতির আওতায় ইউরোপই সিদ্ধান্ত নেবে, কে বা কারা, কোন পরিস্থিতিতে ইইউতে প্রবেশ করতে পারবেন।

এই কৌশলের আওতায় অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, মানবপাচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, আশ্রয়ের সুযোগ বজায় রাখা এবং আশ্রয় ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকানোর পাশাপাশি ইইউর অর্থনীতিকে সচল রাখতে মেধাবী ও দক্ষ কর্মীদের আকৃষ্ট করার পরিকল্পনা রয়েছে।

কমিশনের তথ্যমতে, ইইউজুড়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ খাতে দক্ষতা ও শ্রম ঘাটতি রয়েছে। বৈশ্বিক বাস্তবতায় মেধাবী ও দক্ষ কর্মীদের জন্য ইউরোপকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য। এ জন্য বিদেশি কর্মীদের যোগ্যতা স্বীকৃতি, নিয়ম সহজীকরণ এবং প্রক্রিয়া আরও গতিশীল করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

রিটার্ন হাবের পরিকল্পনা

ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপ ছাড়ার নির্দেশ পাওয়া অভিবাসীদের মধ্যে মাত্র ২৫ শতাংশ নিজ দেশে ফিরেছেন বা ফেরত পাঠানো হয়েছে। এ কারণেই অনিয়মিত ও প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও কার্যকর করাকে ‘সবচেয়ে জরুরি’ কাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কমিশন বলছে, অভিবাসন ও আশ্রয় নীতি কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য দ্রুত, কার্যকর এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন অপরিহার্য।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ইইউর বাইরের দেশে ‘রিটার্ন হাব’ বা প্রত্যাবাসন কেন্দ্র স্থাপনের ধারণাও সামনে এনেছে কমিশন। এসব কেন্দ্রে অনিয়মিত অভিবাসী ও প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের নিজ দেশে পাঠানোর আগে রাখা হবে। কমিশন এই পরিকল্পনাকে ‘নতুন ও উদ্ভাবনী’ চিন্তা হিসেবে তুলে ধরেছে।

ইঙ্গিতে জানানো হয়েছে, প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের ফেরত নিতে উৎস দেশগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ করা হবে। সহযোগিতা না করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথাও ভাবছে ইইউ।

ইতিমধ্যে অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে লিবিয়া, তিউনিশিয়া, মৌরিতানিয়া, মিশর ও মরক্কোর মতো দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। নতুন কিছু দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি নিয়ে আলোচনাও চলছে। অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকাতে সহযোগিতার বিনিময়ে এসব দেশকে অর্থ ও বিনিয়োগ সহায়তা দেবে ইইউ।

-সাইমুন