গাজা উপত্যকাজুড়ে শনিবার ইসরায়েলি বিমান হামলার ধারাবাহিকতায় অন্তত ৩২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
হামাস পরিচালিত গাজার সিভিল ডিফেন্স সংস্থা জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। সংস্থাটি আরও জানায়, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস শহরে বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য স্থাপিত একটি তাঁবুতে হেলিকপ্টার গানশিপ থেকে হামলা চালানো হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেছেন, চলতি মাসের শুরুতে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপের পর এটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা। গত অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, শুক্রবার হামাস যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করায় তার প্রতিক্রিয়ায় একাধিক বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই ইসরায়েল ও হামাস পরস্পরকে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে আসছে।
ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) এক বিবৃতিতে জানায়, পূর্ব রাফাহ এলাকায়—যেখানে অক্টোবরের চুক্তি অনুযায়ী ইসরায়েলি বাহিনী মোতায়েন রয়েছে—“ভূগর্ভস্থ সন্ত্রাসী অবকাঠামো থেকে বেরিয়ে আসা আটজন সন্ত্রাসীকে শনাক্ত করা হয়েছে।”
আইডিএফ জানায়, ইসরায়েল সিকিউরিটি এজেন্সি (আইএসএ)-এর সঙ্গে যৌথভাবে গাজার বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানো হয়। এসব হামলায় “চারজন কমান্ডারসহ আরও কয়েকজন সন্ত্রাসী”, অস্ত্র সংরক্ষণাগার, অস্ত্র তৈরির কেন্দ্র এবং মধ্য গাজার দুটি হামাস-নিয়ন্ত্রিত রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
হামাস এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে অবিলম্বে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, “এই ধারাবাহিক লঙ্ঘন প্রমাণ করে যে ইসরায়েলি সরকার গাজা উপত্যকার বিরুদ্ধে তাদের নৃশংস গণহত্যামূলক যুদ্ধ অব্যাহত রেখেছে।”
হামাস জানায়, খান ইউনিসে নিহতদের মধ্যে একই বাস্তুচ্যুত পরিবারের সাতজন সদস্য রয়েছেন। সিভিল ডিফেন্সের এক মুখপাত্র বলেন, হামলাগুলো আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট, তাঁবু, আশ্রয়কেন্দ্র এবং একটি পুলিশ স্টেশনে আঘাত হানে।
গাজা শহরের শিফা হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানান, সেখানে একটি আবাসিক ভবনে বিমান হামলায় তিন শিশু ও দুই নারী নিহত হয়েছেন।
রয়টার্সের উদ্ধৃতিতে নিহত তিন শিশুর চাচা সামের আল-আতবাশ বলেন,
“আমরা রাস্তায় আমার তিন ছোট ভাতিজিকে খুঁজে পেয়েছি। তারা বলে যুদ্ধবিরতি চলছে—তাহলে সেই শিশুরা কী করেছে? আমরা কী অপরাধ করেছি?”
গাজাজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মরদেহ উদ্ধার এবং একাধিক ভবন ধ্বংস হতে দেখা গেছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গাজা শহরে একটি পুলিশ স্টেশনেও হামলা চালানো হয়েছে, যেখানে অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন।
এই হামলাগুলো এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইসরায়েলি বাহিনী চলতি সপ্তাহে সর্বশেষ ইসরায়েলি জিম্মির মরদেহ উদ্ধারের পর গাজার রাফাহ সীমান্ত ক্রসিংটি রোববার পুনরায় খোলার কথা রয়েছে। এই সীমান্ত পথটি গাজার সঙ্গে মিসরের একমাত্র সংযোগস্থল।
মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে হামলার নিন্দা জানিয়ে সব পক্ষকে “সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের” আহ্বান জানিয়েছে।
যুদ্ধবিরতি আলোচনার অন্যতম মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারও “ইসরায়েলের বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের” নিন্দা জানিয়েছে বলে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ শুরুর ঘোষণা দেন।
প্রথম ধাপে, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে হামাস ও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এর মধ্যে ছিল জিম্মি-বন্দি বিনিময়, আংশিকভাবে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং গাজায় ত্রাণ সহায়তা বৃদ্ধি।
উইটকফ জানান, দ্বিতীয় ধাপে গাজায় একটি টেকনোক্র্যাটিক ফিলিস্তিনি সরকার গঠন, অঞ্চলটির পুনর্গঠন এবং সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ এর মধ্যে হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর অস্ত্র ত্যাগ-অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলার মধ্য দিয়ে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ শুরু হয়। ওই হামলায় প্রায় ১,২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়।
এর জবাবে ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে। হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত গাজায় ৭১ হাজার ৬৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে অন্তত ৫০৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই সময়ে চারজন ইসরায়েলি সেনাও নিহত হয়েছে।
ইসরায়েল অতীতে হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, স্থানীয় গণমাধ্যমের বরাতে এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে যে গাজা যুদ্ধে ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার বিষয়টি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীও স্বীকার করে।
জাতিসংঘ ও অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থাগুলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তা ব্যাপকভাবে উদ্ধৃত হয়। তবে ইসরায়েল গাজায় স্বাধীনভাবে প্রতিবেদন করার জন্য বিবিসিসহ কোনো সংবাদমাধ্যমকে প্রবেশের অনুমতি দেয় না।
সূত্রঃ বিবিসি
বেলাল হোসেন/










