নতুন প্রকাশিত ছবির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার ইঙ্গিত দিয়েছেন, জেফ্রি এপস্টাইনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরের যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে সাক্ষ্য দেওয়া উচিত।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্টারমার বলেন, “সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়ে আমি সব সময়ই বলে এসেছি—যাদের কাছে তথ্য আছে, তাদের সেই তথ্য শেয়ার করতে প্রস্তুত থাকা উচিত।”
তিনি আরও বলেন, “আপনি যদি তা করতে প্রস্তুত না থাকেন, তাহলে নিজেকে ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক বলতে পারেন না। এপস্টাইনের ভুক্তভোগীদেরই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।”
স্টারমারের এই মন্তব্য আসে এপস্টাইন সংক্রান্ত নতুন নথি প্রকাশের পর, যেখানে এমন কিছু ছবি রয়েছে, যাতে দেখা যাচ্ছে অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর মাটিতে শুয়ে থাকা এক অজ্ঞাতপরিচয় নারীর ওপর হাঁটু গেড়ে বসে আছেন।
বিবিসি নিউজ এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তিনি বরাবরের মতোই সব ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
গত নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট সদস্যরা এপস্টাইন তদন্তের অংশ হিসেবে অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরকে প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সে সময় স্টারমার বলেছিলেন, বিষয়টি “ব্যক্তিগতভাবে” তাঁর বিবেচনার ওপর নির্ভর করে।
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস) এপস্টাইন সংক্রান্ত ৩০ লাখের বেশি নথি প্রকাশ করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বাক্ষরিত একটি আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে ছয় সপ্তাহ পর এই নথিগুলো প্রকাশ করা হয়।
নতুন প্রকাশিত ছবিগুলোতে অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরকে এক অজ্ঞাত নারীর ওপর ঝুঁকে থাকতে দেখা যায়। ছবিগুলোর কোনো প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা হয়নি। দুটি ছবিতে দেখা যায়, তিনি সম্পূর্ণ পোশাক পরা ওই নারীর পেটে হাত রেখেছেন। আরেকটি ছবিতে তাঁকে সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়।
ছবিগুলো নিউইয়র্ক শহরে এপস্টাইনের বাসভবনের ভেতরের অংশের সঙ্গে মিল রয়েছে বলে মনে করছে বিবিসি ভেরিফাই। সেখানকার সাজসজ্জা এপস্টাইনের টাউনহাউসের অন্যান্য ছবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে জানানো হয়েছে।
এই ছবিগুলো প্রকাশের ফলে এপস্টাইনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব নিয়ে অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরের ওপর চাপ আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি এ বিষয়ে বারবার সব ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর, যিনি আগে প্রিন্স অ্যান্ড্রু ও ডিউক অব ইয়র্ক নামে পরিচিত ছিলেন, এপস্টাইনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বাড়তে থাকা সমালোচনার জেরে গত অক্টোবরে তাঁর সব রাজকীয় উপাধি হারান।
নথিতে প্রকাশিত আলাদা কিছু ইমেইলে দেখা যায়, এপস্টাইন ২৬ বছর বয়সী এক নারীর সঙ্গে নৈশভোজে বসতে অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এই ইমেইল বিনিময়টি হয় ২০১০ সালের আগস্টে।
ইমেইলে এপস্টাইন লেখেন, ওই নারী লন্ডনে থাকবেন। উত্তরে “দ্য ডিউক” লেখেন, তিনি ২২ তারিখ সকাল পর্যন্ত জেনেভায় থাকবেন, তবে দেখা করতে আগ্রহী। এরপর তিনি জানতে চান, ওই নারী কি এপস্টাইনের কোনো বার্তা নিয়ে আসছেন এবং তার সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য দেওয়ার অনুরোধ করেন। তিনি আরও জানতে চান, ওই নারীর সম্পর্কে এমন কোনো তথ্য আছে কি না, যা জানা দরকার।
এপস্টাইন উত্তরে লেখেন, ওই নারী “২৬ বছর বয়সী, রাশিয়ান, বুদ্ধিমান, সুন্দর, বিশ্বাসযোগ্য” এবং তাঁর কাছে ডিউকের ইমেইল রয়েছে।
এই ইমেইল বিনিময় হয় এপস্টাইনের নাবালককে যৌন কাজে প্রলুব্ধ করার অভিযোগে দোষ স্বীকারের দুই বছর পর। সে সময় তিনি ১৮ মাসের সাজা পেলেও বিশেষ চুক্তির আওতায় দিনে ১২ ঘণ্টা অফিসে কাজ করার সুযোগ পান এবং ১৩ মাস পর মুক্তি পান।
অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর আবারও বলেছেন, এপস্টাইনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি কখনোই এমন কোনো আচরণ দেখেননি বা সন্দেহ করেননি, যা পরে এপস্টাইনের গ্রেপ্তার ও দণ্ডের কারণ হয়।
নতুন নথিতে প্রকাশিত ইমেইলগুলোতে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ নেই বলে জানিয়েছে বিবিসি।
এছাড়া নথিগুলোতে আরও ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, এপস্টাইন প্রায় ১৫ বছর ধরে অ্যান্ড্রুর সাবেক স্ত্রী ও ইয়র্কের সাবেক ডাচেস সারাহ ফার্গুসনকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন।
২০০৯ সালে ফার্গুসন এপস্টাইনের সঙ্গে ইমেইলে বিভিন্ন ব্যবসায়িক ধারণা শেয়ার করেন এবং একাধিক বড় ব্র্যান্ডের সঙ্গে বৈঠকের কথা উল্লেখ করে লেখেন, “জেফ্রি, তুমি আমার জীবনের সেই ভাই, যাকে আমি সব সময় চেয়েছি।”
একই বছরে তিনি ভাড়া পরিশোধের জন্য ২০ হাজার পাউন্ড সহায়তা চান এবং লেখেন, বাড়িওয়ালা সংবাদমাধ্যমে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে।
আরও প্রকাশিত ইমেইলে দেখা যায়, এপস্টাইন চেয়েছিলেন ফার্গুসন একটি বিবৃতি দিয়ে বলুন যে তিনি “পেডোফাইল নন” এবং মিথ্যা অভিযোগে প্রতারিত হয়েছেন। এই বিষয়ে সারাহ ফার্গুসনের কাছেও মন্তব্য চাওয়া হয়েছে।
এদিকে নথিতে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, ২০০৯ সালে এপস্টাইন যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত লর্ড পিটার ম্যান্ডেলসনের সঙ্গী রেইনালদো আভিলা দা সিলভাকে ১০ হাজার পাউন্ড পাঠিয়েছিলেন।
এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে লর্ড ম্যান্ডেলসন বলেন, এপস্টাইনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে তিনি আগেই বিবিসিকে স্পষ্টভাবে সব কথা বলেছেন এবং নতুন করে আর কিছু যোগ করার নেই।
নতুন নথিতে মোট ২ হাজারের বেশি ভিডিও ও ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি রয়েছে। অনেক নথিই ব্যাপকভাবে সম্পাদিত (রেড্যাক্টেড), কোথাও কোথাও পুরো পৃষ্ঠাই কালো করে দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হাউস জুডিশিয়ারি কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্যরা পূর্ণ নথি দ্রুত পর্যালোচনার জন্য বিচার বিভাগের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, আসন্ন জনশুনানির আগে বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি।
উল্লেখ্য, এসব নথিতে কারও নাম বা ছবি থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণ হয় না। এপস্টাইন সংক্রান্ত অন্যান্য নথিতে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের অনেকেই সব ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সূত্রঃ বিবিসি
বেলাল হোসেন/









