আইসিই হেফাজত থেকে পাঁচ বছরের শিশু ও তার বাবাকে মুক্তির নির্দেশ মার্কিন আদালতের

ছবিঃ সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের এক ফেডারেল বিচারক টেক্সাসে অবস্থিত একটি অভিবাসন আটক কেন্দ্র থেকে পাঁচ বছরের এক শিশু ও তার বাবাকে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন। মিনেসোটায় পরিচালিত এক অভিবাসন অভিযানের সময় তাঁদের আটক করা হয়েছিল, যা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

শনিবার দেওয়া রায়ে যুক্তরাষ্ট্রের জেলা বিচারক ফ্রেড বিয়েরি পাঁচ বছর বয়সী লিয়াম কোনেহো রামোসের আটকাদেশকে অবৈধ ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে তিনি “অসীম ক্ষমতার প্রতি বিশ্বাসঘাতক লালসা” এবং “নিষ্ঠুরতা আরোপের” কঠোর নিন্দা জানান, যা তাঁর ভাষায় সমাজের কিছু অংশের মধ্যে দেখা যাচ্ছে।

মিনিয়াপোলিস শহরের একটি উপশহরে প্রিস্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পর লিয়ামকে আটক করার ছবি—নীল রঙের খরগোশের টুপি ও স্পাইডার-ম্যান ব্যাকপ্যাক পরা অবস্থায়-প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন অভিযানের প্রতীক হয়ে ওঠে।

রায়ে বিচারক বিয়েরি লেখেন, “এই মামলার উৎপত্তি হয়েছে সরকারের ভুল পরিকল্পিত ও অদক্ষভাবে বাস্তবায়িত দৈনিক বহিষ্কার কোটা পূরণের চেষ্টার মাধ্যমে, যা শিশুদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করলেও থেমে নেই।”

তিনি আরও লেখেন, “মার্কিন অভিবাসন ব্যবস্থার জটিলতার কারণে আবেদনকারীরা শেষ পর্যন্ত স্বেচ্ছায় বা জোরপূর্বক নিজ দেশে ফিরে যেতে পারেন। তবে সেই প্রক্রিয়া বর্তমান ব্যবস্থার তুলনায় অনেক বেশি সুশৃঙ্খল ও মানবিক হওয়া উচিত।”

বিচারক নির্দিষ্ট করে কোন বহিষ্কার কোটার কথা উল্লেখ করেননি। তবে হোয়াইট হাউসের নীতিবিষয়ক চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার এর আগে বলেছিলেন, প্রতিদিন ৩ হাজার অভিবাসী গ্রেপ্তারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

মিনেসোটায় চলমান এই অভিযানকে ফেডারেল কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অভিবাসন প্রয়োগকারী অভিযান বলে উল্লেখ করেছেন। এতে প্রায় ৩ হাজার ফেডারেল এজেন্ট মোতায়েন করা হয়েছে। অভিযানের জেরে প্রতিদিন অভিবাসন কর্মকর্তা ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছে এবং ফেডারেল এজেন্টদের হাতে দুইজন মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন।

এই প্রাণঘাতী অভিযানের প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং মিনেসোটায় ব্যাপক আন্দোলন গড়ে ওঠে।

মিনিয়াপোলিসের কলাম্বিয়া হাইটস পাবলিক স্কুল ডিস্ট্রিক্ট জানিয়েছে, চলতি মাসে ওই উপশহরে অভিবাসন কর্মকর্তাদের হাতে আটক হওয়া অন্তত চারজন শিক্ষার্থীর একজন ছিল লিয়াম।

স্কুল জেলার সুপারিনটেনডেন্ট জেনা স্টেনভিক বলেন, ২০ জানুয়ারি লিয়ামের পরিবারের ড্রাইভওয়েতে একটি চলন্ত গাড়ি থেকে তাকে নামিয়ে নেওয়া হয় এবং তাকে বাড়ির দরজায় কড়া নাড়তে বলা হয়। তাঁর ভাষায়, এটি অন্য পরিবারের সদস্যদের আটক করার জন্য শিশুটিকে ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহারের শামিল।

তবে সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা দপ্তরের মুখপাত্র ট্রিসিয়া ম্যাকলাফলিন জানান, শিশুটির নিরাপত্তার জন্য একজন আইসিই কর্মকর্তা তার সঙ্গে ছিলেন, যখন অন্য কর্মকর্তারা তার বাবাকে আটক করেন।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স মিনেসোটায় আইসিইর কৌশলের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, এ ধরনের গ্রেপ্তার শিশুদের জন্য ‘মানসিকভাবে আঘাতজনক’ হলেও, “আপনি বাবা-মা হলেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছ থেকে সম্পূর্ণ দায়মুক্তি পেতে পারেন না।”

ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, লিয়ামের বাবা আদ্রিয়ান কোনেহো আরিয়াস ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইকুয়েডর থেকে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন। তবে পরিবারের আইনজীবী জানান, তাঁদের সক্রিয় আশ্রয় আবেদন রয়েছে, যা অনুযায়ী তারা যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে অবস্থান করতে পারেন।

আটকের পর বাবা ও ছেলেকে টেক্সাসের ডিলি শহরের একটি আটক কেন্দ্রে পাঠানো হয়। সেখানে অসুস্থতা, অপুষ্টি এবং শিশু বন্দির সংখ্যা দ্রুত বাড়ার মতো অমানবিক পরিস্থিতির অভিযোগ করেছে মানবাধিকার সংগঠন ও রাজনীতিকরা।

টেক্সাসের কংগ্রেস সদস্য জোয়াকিন কাস্ত্রো ও জেসমিন ক্রকেট এ সপ্তাহে কেন্দ্রটি পরিদর্শন করেন। কাস্ত্রো জানান, ৩০ মিনিটের সফরের পুরো সময় লিয়াম ঘুমিয়ে ছিল এবং তার বাবা বলেন, শিশুটি “বিষণ্ন ও হতাশ” অবস্থায় রয়েছে।

বিচারক বিয়েরির রায়ে শিশুটির একটি ছবি এবং বাইবেলের উদ্ধৃতি সংযুক্ত করা হয়। এর মধ্যে ছিল-“যিশু বলেছিলেন, ছোট শিশুদের আমার কাছে আসতে দাও; তাদের বাধা দিও না”-এবং সংক্ষিপ্ত বাক্য, “যিশু কেঁদেছিলেন।”

বিচারক লেখেন, এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সম্পর্কে সরকারের ‘অজ্ঞতা’ স্পষ্ট করেছে। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের কার্যক্রমের সঙ্গে ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় জর্জের শাসনের তুলনা করেন, যেখানে জনগণকে হয়রানির জন্য ‘অসংখ্য কর্মকর্তাকে পাঠানো’ এবং ‘ঘরোয়া অস্থিরতা’ সৃষ্টির অভিযোগ ছিল।

এই বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ বা স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা দপ্তরের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

লিয়াম ও তার বাবার পক্ষে থাকা জেনিফার স্কারবরো ল’ ফার্ম এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, খুব শিগগিরই তারা পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে পুনর্মিলিত হতে পারবেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, “এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর পরিবারটি এখন একসঙ্গে থাকার এবং কিছুটা মানসিক শান্তি ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাবে-এতে আমরা সন্তুষ্ট।”

এদিকে মিনেসোটার কর্মকর্তারা ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে রাজ্যে অভিবাসন অভিযান বন্ধের আহ্বান জানিয়ে আসছেন। তবে শনিবার এক ফেডারেল বিচারক মিনেসোটার অ্যাটর্নি জেনারেল কিথ এলিসন ও অন্য কর্মকর্তাদের করা আবেদন নাকচ করে দেন, যা অভিযানে সাময়িক স্থগিতাদেশ চেয়েছিল।

অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্দেশ দিয়েছেন, ডেমোক্র্যাট-শাসিত শহরগুলোতে চলমান বিক্ষোভে স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ কোনোভাবেই হস্তক্ষেপ করবে না যদি না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ফেডারেল সহায়তা চায় বা ফেডারেল সম্পত্তি হুমকির মুখে পড়ে।

সূত্রঃ আল জাজিরা

বেলাল হোসেন/