শাফিউল আল ইমরান : বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) আরোপিত ‘অস্বাভাবিক’ সারচার্জ তুলে নেওয়ায় এয়ারলাইন্স কোম্পানিরগুলোর মধ্যে ‘স্বস্তি ফিরছে’। বাংলাদেশে ফ্লাইট পরিচালনাকারীরা বলছেন, এরফলে একদিকে যেমন নতুন বিনিয়োগকারী আসবেন, অপরদিকে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মাত্রাতিরিক্ত সারচার্জ ও দেনার চাপে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া বিনিয়োগকারীরা আবার ফেরার চেষ্টা করবেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারচার্জের কারণে অনেক নতুন বিনিয়োগকারী বিনিয়োগে ভয় পেতেন, সেটা আর থাকবে না। তারা আশা করছেন, আগামীতে এয়ারলাইন্সগুলোর সেবা বাড়বে, আর নতুন বিনিয়োগকারী আসতে উৎসাহীত হবে।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সিদ্ধান্ত এয়ারলাইন্সগুলোর টিকে থাকার সম্ভাবনাকে আরও উজ্জ্বল করবে। এমন এক সময়ে এই সিদ্ধান্ত এলো, যখন ঋণের বোঝা ও পুঞ্জীভূত সারচার্জের কারণে অন্তত তিনটি দেশীয় এয়ারলাইন্স তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
ট্যুর অপারেটরস ও ট্রাভেল এজেন্ট মালিকরা জানিয়েছেন, সারচার্জ কমে যাওয়ার কারণে ট্যুর অপারেটরস ও ট্রাভেল এজেন্ট মালিকদের কোনো লাভ না হলেও ভ্রমণকারীদের জন্য কিছুটা সুফল আশা করছেন।
ট্যাভেলার্স ডায়েরির স্বত্বাধিকারী ওয়াহিদ উদ্দিন আলোকিত স্বদেশকে বলেন, ‘সাধারণত এই চার্জে ট্রাভেল এজেন্সির কোনোরকম হাত নেই অর্থাৎ লাভ কিংবা ক্ষতি কোনোটাই নেই। যাত্রী পর্যায়ে এই সুফল অর্থাৎ ভাড়া যদি কিছুটা কমে তবেই সরকার কর্তৃক কমানো এই চার্জের সফলতা আসবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনেকরি দায়িত্বরত মন্ত্রণালয় সারচার্জের বিষয়ে সঠিক মনিটরিং করা উচিত যাতে একেবারে প্রান্তিক যাত্রী পর্যায়ে এই সুফলটি প্রতিফলন হয়।’
বিভিন্ন দেশের সিভিল এভিয়েশনের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত দেশে এ সারচার্জ ৮ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ১২ শতাংশ, ওমানে ১০ শতাংশ এবং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রতিষ্ঠানভেদে ১২ থেকে ১৮ শতাংশ, পাকিস্তানে আন্তঃব্যাংকিং এক্সচেঞ্জ রেটের ওপর দুই শতাংশ। বর্তমানে বেবিচকের বকেয়ার ওপর মাসে ছয় শতাংশ হারে বছরে সারচার্জ দিতে হচ্ছে ৭২ শতাংশ।
এয়ারলাইন্স অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) সাধারণ সম্পাদক এবং নভোএয়ারের পরিচালক মফিজুর রহমান এই পদক্ষেপকে এ খাতের জন্য ‘বড় স্বস্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি আলোকিত স্বদেশকে বলেন, ‘এতে স্থানীয় এয়ারলাইন্সগুলোর আর্থিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি সেবার মান উন্নত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে যাত্রীদের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের জেনারেল ম্যানেজার (পাবলিক রিলেশনস) মো. কামরুল ইসলাম আলোকিত স্বদেশকে বলেন, ‘সারচার্জ কমানোর ফলে এয়ারলাইন্সের সাসটেনিবিলিটি বাড়বে। যে কারণগুলোর জন্য এয়ার লাইন্স বন্ধ হয়ে যেত সে কারণগুলোর অন্যতম হলো এই সারচার্জ। এটার বিষয়ে যেহেতু সরকার সদয় দৃষ্টি দিচ্ছে, সারচার্জ কমিয়েছে তাই আমি বলবো, পূর্বে যে এয়ারলাইন্সগুলোর বন্ধ হওয়ার মিছিল ছিল সেই মিছিলটা কমবে। তবে, পুরনো সার চার্জগুলো কমাবে কিনা এটা সরকারের সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘নতুন করে কোনো এয়ারলাইন্স বাজারে আসলে সেটা আর অতিরিক্ত সারচার্জের মধ্যে পড়বে না। এই ইন্ডাস্ট্রিতে এয়ারলাইন্সগুলো যে বন্ধ হয়ে যেত সেই বন্ধ হওয়ার মিছিল কমবে। এটাই আমাদের লাভ। আর আমাদের লাভ মানেই ইন্ডাস্ট্রির লাভ।
বাংলাদেশি বিমান ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এটিএম নজরুল ইসলাম আলোকিত স্বদেশকে বলেন, ‘কেউ যদি দিতে না পারে পেনাল্টি দিবে, তবে সেটার একটা লিমিট থাকবে। পৃথিবীর কোনো দেশ খুঁজে পাবেন না ৭২ শতাংশ ইন্টারেস্ট দিতে হয়। একটা নিয়ম থাকে ১৪ শতাংশ, ১১ শতাংশ বা ৮-১০ শতাংশ। এযাবৎ দেশে যেটা ছিল সেটা অযৌক্তিক। যার কারণে জেএমজি, ইউনাইটেড বা রিজেন্টের অনেক টাকা পেনাল্টি হয়ে গেছে, সেগুলোর ফেরা কঠিন হয়ে গেছে।’
যদিও সারচার্জ হ্রাসের ফলে বিমান ভাড়া এখনই কমার সম্ভাবনা কম, তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আর্থিক স্তিতিশীলতা ফিরে আসলে প্রতিযোগিতা ও সেবার মান বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল পাবেন যাত্রীরা। তবে, সারচার্জ কমানোর ফলে সরাসরি কোনো প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সারচার্জ কমানোর ফলে ডাইরেক্ট কোনো সুবিধা হবে না তবে ইনডাইরেক্ট কিছু সুবিধা হবে। যখন সারচার্জের চাপটা থেকে বাঁচবে তখন তারা বেটার সার্ভিস দেওয়ার চেষ্টা করবে।
নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আরেকটি বিষয় হলো; সবচেয়ে বড় কথা হলো; এটার কারণে অনেক এন্টারপ্রেনাররা আসতে চান না। কারণ; তারা দেখেন যখন বিশাল বড় একটা আনইথিক্যাল চার্জ ইমপোজ করে তখন তারা ভাবেন আমাদেরকেও তো এমন বড় একটা চার্জ দিতে হবে। বিমান যদি রাষ্ট্রীয় না হতো বিমানও বলতো এটা বন্ধ করে দিবো। এখান থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। নতুন ইনভেস্টররা আসবেন।’
এর আগে সিভিল এভিয়েশন রুলস ১৯৮৪ অনুযায়ী, বকেয়া বিলের ওপর এয়ারলাইন্সগুলোকে প্রতি মাসে ছয় শতাংশ হারে সারচার্জ দিতে হতো। অর্থাৎ এক বছর দেরি হলে সারচার্জের পরিমাণ দাঁড়াত মূল অর্থের ৭২ শতাংশে, যা আর্থিক পুনরুদ্ধার প্রায় অসম্ভব করে তুলত।
বেবিচকের তথ্যে আগের নিয়মের ফলে সৃষ্ট সমস্যার গভীরতা উঠে আসে। এয়ারলাইন্সগুলোর মোট বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সাত হাজার ৩৫১.৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৭৮ শতাংশ বা পাঁচ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকাই সারচার্জ। ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচটি এয়ারলাইন্সÑ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, নভোএয়ার, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ও জিএমজি এয়ারলাইন্সের কাছে এই পরিমাণ অর্থ পাওনা রয়েছে।
উল্লেখ্য, অ্যারোনটিক্যাল চার্জ বা বিমান চলাচল-সংক্রান্ত ফি পরিশোধে বিলম্বের জন্য বার্ষিক সারচার্জ ৭২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৪.২৫ শতাংশ করা হয়েছে।










