আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজপথের আন্দোলনের পরীক্ষিত সৈনিকদের ওপরই ভরসা রেখেছে বিএনপি। বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে এক সময় যারা ‘ক্যাপ্টেন’ বা শীর্ষ পদে ছিলেন, এমন সাতজন সাবেক ছাত্রনেতাকে এবার ধানের শীষের প্রার্থী করেছে দলটি। এই তালিকায় রয়েছেন ছাত্রদলের সাবেক ৫ জন সভাপতি এবং ২ জন সাধারণ সম্পাদক।
ফজলুল হক মিলন (গাজীপুর-৫): ১৯৯২ সালের তুখোড় ছাত্রনেতা ফজলুল হক মিলন এবার কালীগঞ্জ নিয়ে গঠিত গাজীপুর-৫ আসনে ধানের শীষের কাণ্ডারি। বর্তমানে জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করা মিলনকে এই আসনে ১১-দলীয় ঐক্যের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি এই অঞ্চলের শিল্পায়ন ও বেকারত্ব দূরীকরণের পাশাপাশি কৃষিবান্ধব কর্মপরিকল্পনার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি (লক্ষ্মীপুর-৩): ১৯৯৭ সালের ছাত্রদল সভাপতি এবং বর্তমানে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এ্যানি এবারও নিজের দুর্গ লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে লড়ছেন। তিনি এবার ভোটারদের কাছে ‘অদৃশ্য শক্তির’ নীল নকশা ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন। এ্যানি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, নির্বাচিত হলে লক্ষ্মীপুরকে সন্ত্রাসমুক্ত একটি আধুনিক ও জনবান্ধব জেলা হিসেবে গড়ে তুলবেন।
আজিজুল বারী হেলাল (খুলনা-৪): ২০০৪ সালের রাজপথ কাঁপানো ছাত্রনেতা আজিজুল বারী হেলাল খুলনা-৪ আসন থেকে লড়ছেন। গত ২৪ জানুয়ারি তিনি রূপসায় তার নিজ বাসভবনে ৭৪ দফার একটি বিশাল নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। তার মূল স্লোগান ‘একটি বাড়ি, একটি গাছ’। তিনি রূপসা-তেরখাদা-দিঘলিয়া অঞ্চলকে পরিবেশবান্ধব এবং শিল্পোন্নত করার অঙ্গীকার করেছেন।
সুলতান সালাউদ্দিন টুকু (টাঙ্গাইল-৫): ২০১০ সালের ছাত্রদল সভাপতি ও বর্তমানে বিএনপির প্রচার সম্পাদক টুকু টাঙ্গাইল-৫ আসনে প্রচারণা চালাচ্ছেন। সম্প্রতি টাঙ্গাইল প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভায় তিনি অঙ্গীকার করেছেন যে, তিনি জয়ী হলে টাঙ্গাইল শহরকে কিশোর গ্যাং, মাদক এবং চাঁদাবাজমুক্ত করবেন। তিনি নিজেকে টাঙ্গাইলের মানুষের ‘সেবক ও ভাই’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান।
রাজীব আহসান (বরিশাল-৪): ২০১৪ সালের উত্তাল দিনগুলোতে ছাত্রদলের হাল ধরা রাজীব আহসান এখন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক। তিনি বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) আসন থেকে লড়ছেন। তার নির্বাচনী জনসভাগুলোতে তরুণদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তিনি এই নদীবেষ্টিত অঞ্চলে ভাঙন রোধ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বড় বাজেট বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
আমিরুল ইসলাম খান (সিরাজগঞ্জ-৫): ২০১০ সালে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আমিরুল ইসলাম খান এবার সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী। বেলকুচি-চৌহালী এলাকার তাঁত শিল্পের সংকট নিরসন ও যমুনার ভাঙন রোধ তার প্রধান নির্বাচনী ইস্যু।
হাবিবুর রশিদ (ঢাকা-৯): ২০১২ সালের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদ রাজধানীর ঢাকা-৯ আসনে লড়ছেন। তিনি খিলগাঁও-সবুজবাগ-মুগদা এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসন এবং সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছেন। গত ২৪ জানুয়ারি এক সমাবেশে তিনি বলেন, “কিশোর গ্যাং হলো নীরব আগুনের মতো, আমি নির্বাচিত হলে এই আগুন নেভানোই হবে আমার প্রধান কাজ।”
বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, এই সাতজন নেতা ছাত্র রাজনীতি করার কারণে তৃণমূলের সাথে সুগভীর সম্পর্ক রাখেন। সাবেক ছাত্রনেতাদের মাধ্যমে সংসদীয় আসনগুলোতে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে, যা ভোটের হার বাড়াতে সহায়ক হবে।
বিএনপির প্রার্থী তালিকায় এবার কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক গুরুত্বপূর্ণ পদধারী নেতাদের প্রাধান্য সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ার মতো। ছাত্রদলের সাবেক জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি এবং বর্তমানে কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুল ফরিদপুর-৪ আসনে ধানের শীষের হাল ধরেছেন। অন্যদিকে, খুলনা-৩ আসনে লড়ছেন সাবেক সহ-সভাপতি রকিবুল ইসলাম বকুল, যাকে দলের অন্যতম প্রভাবশালী সংগঠক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শরীয়তপুর-৩ আসনে লড়ছেন সাবেক সহ-সম্পাদক মিয়া নুরুদ্দিন আহমেদ অপু, যার রাজপথের আন্দোলন ও দীর্ঘ নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা নেতা-কর্মীদের মাঝে বাড়তি প্রেরণা জোগাচ্ছে। এছাড়াও টাঙ্গাইল-৩ আসনে এস এম ওবায়দুল হক (সাবেক জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সম্পাদক) এবং মাদারীপুর-৩ আসনে সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আনিসুর রহমান তালুকদার ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।
নির্বাচনী ময়দানে কেবল ছাত্রনেতারাই নন, সাবেক ছাত্রনেত্রীদের বলিষ্ঠ উপস্থিতিও ভোটারদের নজর কাড়ছে। সিলেট-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী তাহসিনা রুশদীর লুনা এর এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কুয়েত মৈত্রী হল শাখা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ছিলেন। গুম হওয়া জননেতা এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী হিসেবে তার প্রতি সাধারণ মানুষের সহমর্মিতা যেমন আছে, তেমনি একজন মেধাবী ও তুখোড় সাবেক ছাত্রনেত্রী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে নিজের যোগ্যতা ও লড়াই করার মানসিকতার প্রমাণ দিয়ে চলেছেন তিনি।
বিএনপি এবার প্রার্থী মনোনয়নে তৃণমূল থেকে কেন্দ্রে উঠে আসা নেতাদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনে সাবেক ছাত্রদল নেতা মো. কামরুজ্জামান এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বা সভাপতি ছিলেন এমন অন্তত আরও ২৫ জন নেতা এবার সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়েছেন। এই নেতারা স্থানীয় রাজনীতির প্রতিটি অলিপলি চেনেন এবং সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে, যা নির্বাচনের দিন বিএনপির জন্য ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনতে পারে।
বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, এই সাবেক ছাত্রনেতারা যেহেতু ছাত্র রাজনীতির ‘জিরো পয়েন্ট’ বা একদম তৃণমূল থেকে রাজনীতি শুরু করেছেন, তাই সাধারণ কর্মী ও মানুষের সাথে তাদের আত্মিক সম্পর্ক অত্যন্ত সুদৃঢ়। তারা কেবল দলীয় প্রার্থী হিসেবে নন, বরং ভোটের দিন কেন্দ্র রক্ষা, ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে আসা এবং যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক দক্ষতা ও রাজপথের সাহসই এবার ধানের শীষের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠবে।
–লামিয়া আক্তার










