ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কালো তালিকাভুক্ত

ইরানে চলমান শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক সহিংসতা এবং রাশিয়াকে ড্রোন সরবরাহের মাধ্যমে ইউক্রেন যুদ্ধে সহায়তার অভিযোগে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-কে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।

ব্রাসেলসে ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ফলে আইআরজিসিকে এখন থেকে আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের (আইএস)-এর মতো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের সমপর্যায়ে গণ্য করা হবে। খবর বিবিসি ও রয়টার্স।

দীর্ঘ সময় ধরে ফ্রান্স ও জার্মানিসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখার স্বার্থে আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে অনিচ্ছুক ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচার দমন-পীড়ন ও গণহারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থানে বড় পরিবর্তন আসে।

ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস ব্রাসেলসে সাংবাদিকদের বলেন, “যদি কেউ সন্ত্রাসীদের মতো আচরণ করে, তাহলে তাকে সন্ত্রাসী হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত। আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করা ইরানের নেতৃত্বের প্রতি একটি শক্তিশালী প্রতীকী বার্তা।” স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোসে ম্যানুয়েল আলবারেস এই সিদ্ধান্তকে ইউরোপের ‘দায়িত্ব ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরঘচি এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, এটি একটি ‘ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ’ এবং ‘বড় কৌশলগত ভুল’।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ধারণা, ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ইরানে সংঘটিত বিক্ষোভে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনী ও আইআরজিসির সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি ইইউ আরও ২১ জন ইরানি কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই তালিকায় ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। নিষেধাজ্ঞার আওতায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ইউরোপে থাকা সম্পদ জব্দ করা হবে এবং ইইউভুক্ত দেশগুলোতে তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা রক্ষার লক্ষ্যে আইআরজিসি গঠন করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বাহিনী শুধু সামরিক শক্তিতে সীমাবদ্ধ না থেকে ইরানের রাজনীতি ও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রকে পরিণত হয়েছে। দেশের কৌশলগত খাতের বড় অংশের ব্যবসা ও শিল্প আইআরজিসির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পাশাপাশি ইরানের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পরমাণু কর্মসূচির তত্ত্বাবধানেও এই বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

আঞ্চলিক তৎপরতার ক্ষেত্রেও আইআরজিসির প্রভাব রয়েছে। হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুতি বিদ্রোহীদের অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। তবে ইইউ নেতারা জানিয়েছেন, আইআরজিসিকে কালো তালিকাভুক্ত করা হলেও ইরানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ করা হবে না।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই সিদ্ধান্ত ইরানকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও একঘরে করে তুলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে পরমাণু চুক্তি পুনরুজ্জীবনের যেকোনো কূটনৈতিক উদ্যোগ এখন আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আফরিনা সুলতানা/