মিয়ানমারের স্ক্যাম মাফিয়ার ১১ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করল চীন

ছবিঃ সংগৃহীত

চীন মিয়ানমারের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত স্ক্যাম সেন্টার পরিচালনাকারী কুখ্যাত ‘মিং’ মাফিয়া পরিবারের ১১ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।

চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশের একটি আদালত গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এই ১১ জনকে হত্যা, অবৈধ আটক, প্রতারণা এবং জুয়ার আসর পরিচালনাসহ বিভিন্ন অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। ২০২৫ সালে তাদের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হয়।

মিং পরিবার ছিল এমন একাধিক শক্তিশালী গোষ্ঠীর একটি, যারা মিয়ানমারের লাউক্কাইং শহর নিয়ন্ত্রণ করত। একসময় দরিদ্র ও পশ্চাৎপদ এই শহরটিকে তারা ক্যাসিনো ও লালবাতি এলাকার ঝলমলে কেন্দ্রে পরিণত করেছিল।

২০২৩ সালে মিং পরিবারের স্ক্যাম সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িত জাতিগত মিলিশিয়ারা লাউক্কাইংয়ের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর মিং পরিবারের সদস্যদের আটক করে চীনের হাতে তুলে দেয়।

আইনহীন ক্যাসিনো শহরে চীনা মাফিয়ার পতন

এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মাধ্যমে বেইজিং সম্ভাব্য প্রতারকদের জন্য কঠোর বার্তা দিতে চেয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তবে স্ক্যাম ব্যবসা এখন মিয়ানমার-থাইল্যান্ড সীমান্ত, পাশাপাশি কম্বোডিয়া ও লাওসে সরে গেছে যেখানে চীনের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, মিয়ানমার ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অনলাইন প্রতারণা চালানোর জন্য কয়েক লক্ষ মানুষকে মানবপাচারের শিকার করা হয়েছে। এদের মধ্যে হাজার হাজার চীনা নাগরিক রয়েছেন। প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরাও প্রধানত চীনা, যাদের কাছ থেকে বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী স্ক্যাম ব্যবসা বন্ধে ব্যর্থ হওয়ায়—যেখান থেকে তারা প্রায় নিশ্চিতভাবেই লাভবান হচ্ছিল—চীন ২০২৩ সালের শেষ দিকে শান রাজ্যে একটি জাতিগত বিদ্রোহী জোটের অভিযানে নীরব সমর্থন দেয়। ওই জোট সেনাবাহিনীর কাছ থেকে বড় এলাকা দখল করে নেয় এবং সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ শহর লাউক্কাইংয়ের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

কারা এই মিং পরিবার?

মিং পরিবারের এই ১১ সদস্যই প্রথম মিয়ানমারভিত্তিক স্ক্যাম চক্রের নেতা, যাদের চীন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করল। তবে এটাই শেষ নয়।

গত নভেম্বর বাই  পরিবারের পাঁচ সদস্যকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ওয়েই (Wei) ও লিউ (Liu) পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে চলমান বিচার এখনও শেষ হয়নি।

মিং পরিবারের বিচার কার্যক্রম বন্ধ দরজার আড়ালে অনুষ্ঠিত হয়। তবে সাজা ঘোষণার সময় ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যসহ অন্তত ১৬০ জনকে আদালতে উপস্থিত থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

চীনের সর্বোচ্চ আদালতের তথ্যমতে, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে মিং পরিবারের স্ক্যাম কার্যক্রম ও জুয়ার আসর থেকে ১০ বিলিয়ন ইউয়ানের বেশি আয় হয় (প্রায় ১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। এসব অপরাধে অন্তত ১৪ জন চীনা নাগরিক নিহত এবং বহু মানুষ আহত হন।

মিং পরিবারের আরও ২০ জন সদস্যকে পাঁচ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পরিবারের প্রধান মিং শুয়েচাং ২০২৩ সালে গ্রেপ্তার এড়াতে গিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে সে সময় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দাবি করেছিল।

গ্রেপ্তার হওয়া সদস্যদের স্বীকারোক্তি চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়, যাতে প্রতারণা চক্র নির্মূলে সরকারের কঠোর অবস্থান তুলে ধরা হয়।

২০০০ সালের শুরুর দিকে লাউক্কাইংয়ে ‘গডফাদার’ ধাঁচের কয়েকটি পরিবার ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে। এর আগে ওই এলাকার তৎকালীন যুদ্ধবাজ নেতাকে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে উৎখাত করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মিন অং হ্লাইং—যিনি ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের সামরিক সরকারের প্রধান হন।

মিং শুয়েচাং পরিচালিত ‘ক্রাউচিং টাইগার ভিলা’ ছিল লাউক্কাইংয়ের সবচেয়ে কুখ্যাত স্ক্যাম কেন্দ্রগুলোর একটি।

প্রথমদিকে জুয়া ও দেহব্যবসাই ছিল এসব পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। পরে তারা অনলাইন প্রতারণা শুরু করে, যেখানে অপহৃত মানুষদের জোরপূর্বক কাজ করতে বাধ্য করা হতো।

কড়া নিরাপত্তাবেষ্টিত এই বিশাল কম্পাউন্ডগুলোর ভেতরে সহিংসতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। মুক্তিপ্রাপ্ত কর্মীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, মারধর ও নির্যাতন ছিল সেখানে নিত্যদিনের ঘটনা।

বেলাল হোসেন/