শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে গুরুতর আহত শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিমের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।
এর আগে বুধবার বিকেলে ঝিনাইগাতী উপজেলা পরিষদ মাঠে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
শেরপুর–১ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী হাফেজ রাশেদুল ইসলাম রাশেদ রেজাউল করিমের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, বুধবার বিকেলে শেরপুর–৩ আসনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার উদ্যোগে একটি ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিএনপি সমর্থকেরা দেরিতে অনুষ্ঠানে আসেন। এ সময় চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে জামায়াতের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁদের বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতি হয়। একপর্যায়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে জামায়াত সমর্থকদের ওপর হামলা চালায়। এতে জামায়াতের অর্ধশতাধিক সমর্থক আহত হন। গুরুতর আহত তিনজনকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে রাত ৯টা ২০ মিনিটে মাওলানা রেজাউল করিম মারা যান।
তিনি আরও বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ও ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধে, বিএনপি প্রার্থীসহ সবার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে জামায়াত নেতার মৃত্যুর প্রতিবাদে বুধবার রাতে জেলা জামায়াতের উদ্যোগে শহরে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের প্রধান ফটকে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাফিজুর রহমান বলেন, বিএনপির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে শেরপুর–৩ (শ্রীবরদী–ঝিনাইগাতী) আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নিয়ে বুধবার বিকেলে ঝিনাইগাতী স্টেডিয়ামে ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানের আগেই চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে তর্ক-বিতণ্ডা শুরু হয়, যা পরে সংঘর্ষে রূপ নেয়।
ঝিনাইগাতী উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব লুৎফর রহমান জানান, বেলা আড়াইটায় অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা ছিল। তাঁরা দুপুর ২টার দিকে অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে দেখেন, বসার জন্য রাখা ৫০০টি চেয়ার জামায়াত–শিবিরের নেতাকর্মীরা দখল করে নিয়েছেন। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হলে তিনি মঞ্চে থাকা জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ নুরুজ্জামান বাদলকে সহযোগিতার আহ্বান জানান। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। একপর্যায়ে জামায়াত–শিবিরের লোকজন বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এতে উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মান্নান, যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলামসহ ২৫–৩০ জন আহত হন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, জামায়াত–শিবিরের ৮০০ থেকে ১ হাজার নেতাকর্মী পরিকল্পিতভাবে রড ও লাঠিসোঁটা নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হন। বিএনপির পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো প্রস্তুতি ছিল না।
অন্যদিকে বিএনপির অভিযোগ নাকচ করে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদল বলেন, অনুষ্ঠান শুরুর আগেই বিএনপির সন্ত্রাসীরা কোনো কারণ ছাড়াই জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এতে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। আহতরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে পারছেন না, কারণ সেখানে বিএনপির সশস্ত্র লোকজন অবস্থান করছে বলে তিনি দাবি করেন।
এদিকে বিকেল ৫টার দিকে ঝিনাইগাতী বাজারে উপজেলা বিএনপির উদ্যোগে একটি বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল নেতাকর্মীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, নিরীহ নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে কাউকে আইন হাতে না নেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
তবে সমাবেশ শেষে আবারও সংঘর্ষ শুরু হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত দফায় দফায় সংঘর্ষ চলতে থাকে। এতে আরও কয়েকজন গুরুতর আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও সেনাবাহিনী কাজ করে।
ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আশরাফুল আলম রাসেল বলেন, অনুষ্ঠান শুরুর আগেই চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
শেরপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) কামরুল হাসান বলেন, বুধবার ঝিনাইগাতীতে ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১২ জন গুরুতর আহত হন। তাঁদের মধ্যে একজন জামায়াত নেতা নিহত হয়েছেন।
ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে বলে জানান তিনি। এখনো কোনো পক্ষ মামলা করেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান এসপি কামরুল হাসান।
— সাইমুন










