জনপ্রিয়তার জোয়ারে গা ভাসাতে চাই না: মীর রাব্বি

ঝিনাইদহের ছেলে মীর রাব্বি। আজ তিনি বাংলাদেশের অতি পরিচিত মুখ। দরাজ কণ্ঠের সঙ্গে পরিমিত অভিনয় দিয়ে দর্শকদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন অল্প সময়ে। গত বছর ভালোবাসা দিবসে নির্মাতা জাহিদ প্রীতমের ‘বুক পকেটের গল্প’ নাটকে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। ক্যারিয়ারের শুরুতে রেডিও জকি হিসেবে পরিচিতি পান তিনি। সঙ্গে বিজ্ঞাপনচিত্রের নেপথ্য কণ্ঠেও নিয়মিত শোনা যায় তাকে। এর মধ্যে বড় পর্দাতেও অভিনয় করেছেন। গুণী এই শিল্পী আলোকিত স্বদেশের আমন্ত্রণে অফিসে এসেছিলেন। তার সঙ্গে এক প্রাণবন্ত আড্ডায় ক্যারিয়ারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন বিথী রানী মণ্ডল।

আপনার ক্যারিয়ারের বাঁকবদল হয়েছে কোন নাটকে বলে মনে করেন?
বুক পকেটের গল্প নাটকটি আমার ক্যারিয়ারে মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। মুক্তির দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ইউটিউবে ৪৮ লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে নাটকটি। এটির জন্য কয়েকটি কাজও ছেড়ে দিয়েছি। সময় নিয়ে কাজটি করতে চেয়েছি, ফলে অন্য কাজ করিনি। নির্মাতা (জাহিদ প্রীতম) আমাকে যথেষ্ট সময় দিয়েছেন; দুজনের ভালো বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। চিত্রনাট্যের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত জীবনের খানিকটা মিল রেখেছেন তিনি।

‘বুক পকেটের গল্প’তে মাহফুজ চরিত্র দিয়ে রীতিমতো বাজিমাৎ করেছেন আপনি, দর্শক মনে রাখবে অনেকদিন …
আমি আপ্লুত। এত বেশি ফিডব্যাক আসবে আশা করিনি। কাজটির জন্য পরিচালক এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ওপর বিশ্বাস ছিল। আমরা একেবারে শেষ পর্যন্ত ভালো করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলাম। আমার কাছে মনে হচ্ছে, বর্তমানে এ ধরনের গল্প বলার কিছুটা অভাব ছিল। দর্শকদের মন্তব্য দেখে মনে হয়েছিল, অনেকে নতুন করে আবার নাটক দেখায় ফিরেছেন কিংবা যারা ইউটিউব নাটকে তেমন প্রত্যাশা রাখেন না, তারাও নতুন করে প্রত্যাশার কথা বলছেন। তাই ‘বুক পকেটের গল্প’ ওয়াইড রেঞ্জ অব পিপলকে এনগেজড করেছে।

তাকদীর (হইচই), ভালো থেকো ফুল (হইচই), তীরন্দাজ (বায়স্কোপ), ভ্রম (বায়োস্কপ), ইন্টার্নশিপ (চরকি), বুক পকেটের গল্পের মতো নন্দিত সব কাজ করেছেন; কিন্তু আপনার প্রতিটি কাজে গ্যাপ! আরেকটু বেশি কাজ করা উচিত বলে মনে করেন?

অবশ্যই ব্যস্ত হতে চাই। তবে আমাকে নিয়ে কাজ করতে চাইতে হবে। এর সঙ্গে বাজার ব্যবস্থা, ভিউসের ব্যাপার যুক্ত আছে। আবার আমাকে কোনো কাজে নিতে চাইলে আমি কাজটি করার তাড়না অনুভব করছি কিনা সেটাও দেখতে হবে। সঙ্গে গল্প, চরিত্র পছন্দের ব্যাপার থাকে। আমিও চাই ভালো ভালো কাজ করি, কিন্তু সবকিছু ব্যাটে-বলে মিলে যাওয়া দুরুহ হয়। গ্যাপ থাকলেও আমি অনেকগুলো কাজ করেছি। কেন দেখা হলো না, কাঠ গোলপপের বিয়ে, এমনি দিনে তাওে বলা যায়, স্কুল গেট, কে কখন কোথায় এছাড়াও অনেক ভালো ভালো কাজ গত বছর করেছি।

কাজ করলে এতো ভিউস দিতে হবে এমন কোনো বিষয় চাপিয়ে দেয়া হয় বা মানসিক চাপ থাকে? আমি কখনই ভিউ যুদ্ধে ছিলাম না। এর আগে যেসব কাজ করেছি সেগুলো ওটিটিতে যাওয়ার পর ইউটিউবে এসেছে। কিন্তু এবারই প্রথম ইউটিউবের জন্য কাজ (বুক পকেটের গল্প) করলাম। তাই ভিউ যুদ্ধ বা জার্নিতে টিকবো কিনা বা আগাতে পারবো কিনা সেটা ভাবার সময় পাইনি। পুরো কনটেন্টে আমার ক্যারেক্টারে যতটুকু করার জায়গা আমি ফ্রেশ মাইন্ডে সেটা করার চেষ্টা করি।

আপনার কণ্ঠ কি আল্লাহ প্রদত্ত নাকি পরিচর্যার ফসল! কণ্ঠের পরিচর্যা করতে হয়?
একটু তো ন্যাচারালি বাকিটা অ্যাজ ইউ সেইড গড গিফটেড! পরিচর্যা বলতে ছোটবেলা কবিতা পড়তাম, ওয়ার্কশপ কিংবা থিয়েটার করতাম। এখন বিজ্ঞাপনে ভয়েস দেই। এই কাজের জন্য যতটুকু যা করতে হয় এটাই পরিচর্যা। এর বাইরে কিছু করিনা।

অভিনয়ের পাশাপাশি আপনি বিজ্ঞাপনের নেপথ্যেও কণ্ঠ দেন? অভিনয় এবং নেপথ্য কণ্ঠ দেওয়া কোনটা উপভোগ করেন বেশি?
আসলে দুটি কাজের মাধ্যম দুধরনের। বাচিকশিল্পী হিসেবে কাজটা ভীষণ উপভোগ করি। প্রতিটি বিজ্ঞাপনের ভিন্ন মুড। কোথাও আবেগ দিতে হয়, কোথাও ধারাবর্ণনা দিতে হয়, কোথাও চরিত্রের মতো বলতে হয়। এই কাজে থাকার কারণে অভিনয়ে বেছে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। অভিনয়ে অনেক কিছুর প্রয়োজন হয়। আয়োজন লাগে প্রস্তুতি নিয়ে যেতে হয়, সারাদিন অনেক দৃশ্য ধারণ করতে হয়, সহ শিল্পী থাকে । বার বার রির্হাসেল করতে হয়।

নাটক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কোন বিষয়কে প্রাধান্য দেন বেশি?
প্রশংসা কিংবা জনপ্রিয়তার জোয়ারে গা ভাসাতে চাই না। কোনো পাণ্ডুলিপি আসলে গল্প ও চরিত্র বুঝে কাজে যুক্ত হই। গল্পের সঙ্গে আমার চরিত্রটাকেও বিবেচনায় রাখি। পর্দার আমার চরিত্রের উপস্থিতি কতটুকু, সেটা কোনো ব্যাপার নয়। চরিত্রটা কতটা অর্থবহ, সেটা দেখি। সব ধরনের কাজ করে প্রতিদিনই চেহারা দেখাতে চাই না।

সিনেমা নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
ইদানীং তো সিনেমায় কাজ করছি। ভবিষ্যতে আমি আরো বেশি কাজ করতে চাই সিনেমায় সময় সুযোগে গল্প সব কিছুর ওপর নির্ভর করে। আমার মনে হয় এখন বড় ধরনের কমার্শিয়াল ছবির জন্য প্রস্তুত না। আমি নাটকের ইন্ডাস্ট্রিতে, ওটিটিতে ছোট ছোট করে কাজ করে যেতে চাই। তারপর নির্ভর করবে আমি বড় সিনেমার জন্য প্রস্তুত কি না; কিন্তু এর মধ্যে আমি ৩টি সিনেমায় কাজ করেছি। ৩টা তিন রকমের সিনেমা। একটা একদম মফস্বলের গল্প এবং এইটা খুবই ভালো হওয়ার সম্ভবনা আছে। সিনেমা তিনটাই ভালো হওয়ার সম্ভবনা আছে। কিন্তু এখন বিগ বাজেটের সিনেমা কাজ করছি না। একদম ইন্ডিপেন্ডেন্ট সিনেমায় কাজ করছি। দেখা যাক মুক্তি পেলে দর্শক কিভাবে গ্রহণ করে। সিনেমা পরিচালনা করার ইচ্ছা এখন নাই। কিন্তু ভবিষ্যতে ইচ্ছে আছে।

আজ থেকে ৫ বছর পর আপনাকে কোথায় দেখতে পাবো বেশি?
অডিও ভিজুয়ালি কাজ করতে চাই এবং কাজ তো অনেক করি সব কাজ তো ভালো হয় নাহ। পাঁচ বছর বছর পর যেনো বলতে পারি, ঝুলিতে বলার মতো বেশ কিছু ভালো কাজ আছে।

থিয়েটার নাকি টেলিভিশন কোন মাধ্যমে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?
মঞ্চ করতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু মঞ্চ নাটক করার মতো সময় নেই এখন; কিন্তু ভাবনায় আছে ছোট ছোট চরিত্র নিয়ে অল্প জায়গায় কাজ করা যায় কি না। টেলিভিশন প্রোডাকশন অন্য রকম এখন মঞ্চে সময় দেওয়ার মতো সময় নেই। আমি কাজ করলে সেটা অডিও ভিজুয়ালই করবো।

নতুন বিজ্ঞাপনে কি ভয়েস দিচ্ছেন?
শুটিং না থাকলে ভয়েস দেই। ভয়েস দিতে সেটা ইনজয় করি।

আপনার জীবনে প্রেম এসেছিল কত বার?
সবার জীবনে প্রেম আসে। আমার ও এসেছে। বহুবার প্রেমে পরেছি। দাগ কেটে যাওয়ার মতো প্রেম এসেছে। তাকে মিস করি না। কিন্তু মনে করি। একটা বয়সের পর জীবনের অনেক কিছু সহজ ভাবে উপলব্ধি করতে শিখতে হয়। আর তখন আমাদের চাওয়া পাওয়াগুলো আগের মতো থাকে না। এখন আমাদের দুজনের পথ আলাদা হয়ে গেছে জীবন আলাদা হয়ে গেছে। আমার মনে হয় পুরোনো কোনো স্মৃতি নিয়ে এখন আর যোগাযোগ করার মতো কিছু নেই।

বিয়ে করছেন কবে?
আমার মনে হয় না এখন বিয়ের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত আমি। এই সময়ে জনপ্রিয় তারকাদের বিচ্ছেদ দেখছি। তা দেখে বিয়ে করছি না বিষয়টা এমন নাহ।

অভিনয় করতে কখনো পরিবার থেকে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন কি না?
আমার মা-বাবা সব সময় আমার মন যা চায় সেই দিকটাকে গুরুত্ব দিয়েছে। যেই কাজের প্রতি আমার আগ্রহ বেশি সেই কাজের প্রতি আমাকে উৎসাহিত করেছে সব সময়।

যখন শুটিং থাকে না অবসর কাটে কীভাবে?
বই পড়তে পছন্দ করি। তাছাড়া একসময় ছবি আঁকতে পছন্দ করতাম। ঘুরতে যেতে পছন্দ করি। সেটা দেশে হোক কিংবা দেশের বাহিরে। পাহার সমুদ্র দুটোই সুন্দর। ইউরোপে যেতে চাই। আমেরিকা মোটামুটি ঘুরেছি।

একজন অভিনেতার কী কী গুণাবলি থাকা বলে আপনার মনে হয়?
শিখতে চাওয়ার মতো মন মানসিকতা। কারণ প্রত্যক দিনই আমাদের শিখতে হয়। প্রত্যেক দিনই জানবার চেস্টা করতে হয়। সেট,আসপাশ পারিপার্শ্বিকতা সব জায়গা থেকেই কিছু না কিছু শিখতে হয়। আমার মনে হয় ওপেন থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ।

বিথী রানী মণ্ডল/