অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের বিষয়ে নীরবতায় দুদক
রাজনীতির ইতিহাসে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক ভিন্নমাত্রার গুরুত্ব বহন করছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাধারণ ভোটার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ ও উত্তেজনা। তবে নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি বিশেষ পদক্ষেপ রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনে অংশ নেয়া একটি দলের ১৬ জন প্রার্থীর সম্পদের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। তবে প্রশ্ন উঠেছে ক্ষমতাসীন বা প্রভাব বিস্তারকারী নতুন রাজনৈতিক শক্তি এবং অন্যান্য দলের প্রার্থীদের বিষয়ে দুদকের নীরবতা নিয়ে।
দুদক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়া বিএনপির ১৬ জন প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও তদন্তের স্বার্থে দুদক এখনই ওই ১৬ জন প্রার্থীর নাম ও পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হয়নি, তবে জানা গেছে, এই প্রার্থীরা সকলেই বিত্তশালী এবং দলের নীতিনির্ধারণী বা প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত। দুদকের দাবি, সম্পদের উৎসের বৈধতা এবং হলফনামায় প্রদত্ত তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যেই এই অনুসন্ধান।
নির্বাচন কমিশনের জমা দেওয়া হলফনামা এবং টিআইবির (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই মূলত দুদকের এই তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই প্রার্থীদের ঘোষিত আয়ের সঙ্গে তাদের প্রকৃত সম্পদের অসামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে, অতীতে যারা বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার কাছাকাছি ছিলেন বা ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের দিকেই সন্দেহের তীর বেশি।
সম্প্রতি দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক সংবাদ সম্মেলনে ত্রয়োদশ নির্বাচনের প্রার্থীদের সম্পদের খতিয়ান তুলে ধরে। টিআইবির সেই প্রতিবেদনে জানানো হয়, এবারের নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রার্থীদের মধ্যে ৮৯১ জনই কোটিপতি। রাজনীতি এখন আর জনসেবা বা ত্যাগের বিষয় নয়, বরং বিত্তবানদের অলংকারে পরিণত হয়েছে—এমন ইঙ্গিতই ছিল টিআইবির বক্তব্যে। টিআইবি যদিও প্রতিবেদনে কোনো প্রার্থীর নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেনি, তবে এই পরিসংখ্যান প্রকাশের পরপরই নড়েচড়ে বসে দুদক।
এ ব্যাপারে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, এই ‘শতকোটি টাকার মালিক’ সিংহভাগ সদস্যই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ২৫ জনের মধ্যে ১৬ জনই বিএনপির সরাসরি প্রার্থী। বাকি ৯ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করলেও, তারা মূলত বিএনপিরই বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র মোড়কে নির্বাচন করা নেতা। অর্থাৎ শতকোটি টাকার মালিকদের তালিকার প্রায় পুরোটাই বিএনপির দখলে।
টিআইবির এই তালিকাকে ‘সোর্স ম্যাটেরিয়াল’ বা প্রাথমিক তথ্য হিসেবে গ্রহণ করে বিএনপির ওই ১৬ জন প্রার্থীর আয়ের উৎস খুঁজতে মাঠে নেমেছে সংস্থাটি।
এদিকে দুদকের এই অনুসন্ধান প্রক্রিয়াকে অনেকেই সাধুবাদ জানালেও, সংস্থাটির নিরপেক্ষতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, দুদক কি কেবল একটি নির্দিষ্ট দলের প্রার্থীদের টার্গেট করছে? কারণ, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং বিভিন্ন নথিপত্র অনুযায়ী, নির্বাচনে অংশ নেয়া অন্যান্য দলের অনেক প্রার্থীর বিরুদ্ধেও সম্পদের তথ্য গোপন বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অন্যতম প্রার্থী এবং ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পরিচিত মুখ সারজিস আলমের বিষয়টি এখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। নিজেকে ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দেয়া সারজিস আলমের নির্বাচনী হলফনামা এবং আয়কর নথির তথ্যে বড় ধরনের গরমিল রয়েছে বলে একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। সাধারণত আয়কর নথি ও হলফনামার তথ্যে গরমিল থাকলে তা দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে বা অন্তত অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
কিন্তু বিস্ময়করভাবে, এনসিপি বা সারজিস আলমের বিষয়ে দুদক এখন পর্যন্ত কোনো প্রকার অনুসন্ধান শুরু করেনি। শুধু সারজিস আলমই নন, এনসিপির অন্য কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধেও দুদকের কোনো তদন্ত চলমান নেই। যেখানে গণমাধ্যমে সুনির্দিষ্ট তথ্যভ্রান্তির খবর এসেছে, সেখানে দুদকের এই নীরবতা জনমনে প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনকালীন সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষ আচরণ অত্যন্ত জরুরি, নতুবা নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো অনুসন্ধানে নামেনি দুদক। জামায়াতে ইসলামী এই নির্বাচনে একটি শক্ত অবস্থান নিয়ে মাঠে নেমেছে এবং তাদের অনেক প্রার্থীর বিরুদ্ধেই অতীতে বিভিন্ন সময়ে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে দলটির প্রার্থীরা দুদকের আতশ কাঁচের বাইরেই রয়ে গেছেন।
অন্যদিকে, জাতীয় পার্টির (জাপা) চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। দলটির কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনুসন্ধান চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জাতীয় পার্টির ওপর এই চাপ মূলত রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হতে পারে। বিএনপির ১৬ জন হেভিওয়েট প্রার্থীর বিরুদ্ধে তদন্ত যতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, জাপার বিষয়টি ততটা আলোচনায় আসছে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের বিষয়ে দুদকের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শুধুমাত্র একটি দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান আর প্রভাব বিস্তারকারী নতুন রাজনৈতিক শক্তি এবং অন্যান্য দলের প্রার্থীদের বিষয়ে দুদক নীরবতা পালন করলে সেই প্রক্রিয়াটি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বিতর্ক সৃষ্টি হবে। এদের বিরুদ্ধে তথ্যবিভ্রাট ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ হলেও দুদকের নির্লিপ্ততা চোখে পড়ার মতো। এমনকি দুদকের এমন অনুসন্ধান প্রক্রিয়াকে কেউ কেউ পক্ষপাত দোষে দুষ্ট বলে দাবি করলেও আশ্চর্য্য হবোনা।
তিনি বলেন, এনসিপি ও জামায়াত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় তথ্যবিভ্রাট ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও এদের কোনো সদস্যদের বিরুদ্ধেই দুদক উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো উদ্যোগ গ্রহন করেনি।
নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে এই ধরনের তদন্ত কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে দুর্নীতি দমন কমিশন বরাবরের মতোই আইনি প্রক্রিয়ার দোহাই দিয়েছে।
দুদকের মহাপরিচালক আক্তার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে কাজ করে থাকি। কমিশন কারো রাজনৈতিক পরিচয় দেখে অনুসন্ধান করে না, বরং অভিযোগের সারবত্তা বিচার করে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে এবং তা প্রমাণসাপেক্ষ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
এনসিপি প্রার্থী সারজিস আলম বা অন্যদের বিষয়ে তদন্ত না করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, অথবা কেউ যদি তথ্য-উপাত্তসহ অভিযোগ উপস্থাপন করেন, তবে কমিশন আইন ও বিধি অনুযায়ী বিষয়গুলো খতিয়ে দেখবে।’
তবে সাধারণ ভোটাররা চান, দুর্নীতিবাজ যেই হোক— হোক সে বিএনপির, জাতীয় পার্টি, এনসিপির কিংবা জামায়াতের— তাদের সবার বিচার হোক। কিন্তু নির্বাচনের মাঠে যখন দেখা যায় আইনের প্রয়োগ একপেশে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়। বিএনপির ১৬ প্রার্থীর বিরুদ্ধে তদন্ত হয়তো যৌক্তিক, কিন্তু একই অপরাধে বা সন্দেহে অভিযুক্ত এনসিপি নেতাদের ছাড় দেয়া হলে তা নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সমতল ক্রীড়াভূমিকে নষ্ট করতে পারে। বিএনপির ১৬ জন ‘শতকোটিপতি’ প্রার্থীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান নিঃসন্দেহে কালো টাকার বিরুদ্ধে একটি বার্তা। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠে, সারজিস আলমসহ এনসিপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের বিষয়ে নীরবতা একটি অমিমাংসিত রহস্য হিসেবেই থেকে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষায় দুদকের নিরপেক্ষতা প্রমাণের এখনই উপযুক্ত সময়।