বাংলাদেশে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে ভোটের দিনের আগেই শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ, স্পষ্ট আইন-কানুন, ডিজিটাল সুরক্ষা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। মঙ্গলবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় আঞ্চলিক নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী এবং রাজনৈতিক অংশীজনরা অংশ নেন।
গোলটেবিল আলোচনায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মালদ্বীপের সাবেক নির্বাচন কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আকরাম, এবং ন্যাশনালিস্ট ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (এনডিএম)-এর চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ।
তাঁরা নির্বাচন ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং আস্থা তৈরির বিভিন্ন দিক নিয়ে মতামত দেন।
নেপালের সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার দিনেশ কুমার থাপালিয়া আঞ্চলিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ভুয়া তথ্য, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং নিয়ন্ত্রণহীন ডিজিটাল প্রচারণা নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে নির্বাচনের সুরক্ষাও হতে হবে ডিজিটাল। অনলাইন পরিসর অরক্ষিত থাকলে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ঝুঁকির মুখে পড়ে।
নেপালের জ্যেষ্ঠ নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বিশেষজ্ঞ রমেশ অধিকারী বলেন, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জন্য মানবাধিকার ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য প্রয়োজন।
তিনি বলেন, মানবাধিকারের চেতনা ছাড়া ভোট অর্থহীন। আবার শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া সেই চেতনাও নিরাপদ থাকে না। তিনি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, স্বচ্ছতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন।
আলোচনা পরিচালনা করেন ঢাকা ফোরাম ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কৌশলবিদ আশফাক জামান। তিনি বলেন, নির্বাচনকে আলাদা কোনো ঘটনা হিসেবে না দেখে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া হিসেবে বুঝতে হবে।
তিনি বলেন, ভোট দেওয়ার অনেক আগেই প্রতিষ্ঠান, নিয়ম-কানুন এবং আচরণের মধ্য দিয়ে আস্থা তৈরি হয় বা নষ্ট হয়। নির্বাচন যদি সবার না হয়, তাহলে তা কারওই থাকে না। এ সময় তিনি বাংলাদেশের বড়, তরুণ এবং নারী-পুরুষের ভারসাম্যপূর্ণ ভোটার গোষ্ঠীর কথাও উল্লেখ করেন।
নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কসোভো, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান ও অস্ট্রেলিয়ার দূতাবাসের প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নেন। তাঁরা সামগ্রিক পরিবেশকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন এবং আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে চলমান প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির মাত্রার প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে আগাম সুরক্ষা ব্যবস্থা, স্বচ্ছতা এবং অংশীজনদের অন্তর্ভুক্তিমূলক সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দেওয়াকে নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানান। অনেক কূটনৈতিক প্রতিনিধি নারী ভোটারদের নিরাপদ ও অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টির ওপরও গুরুত্ব দেন।
রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেন। বিএনপির প্রতিনিধি অপর্ণা রায় বলেন, নির্বাচনী পরিকল্পনায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়গুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ন্যাশনালিস্ট ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (এনডিএম)-এর চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ ডাকযোগে ভোটদান ব্যবস্থায় আরও প্রস্তুতি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস)-এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ. এস. এম. রিদওয়ানুর রহমান বলেন, যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম সংকট ব্যবস্থাপনা প্রস্তুত রাখা জরুরি। তিনি প্রতিরোধমূলক সুরক্ষার পাশাপাশি প্রস্তুতির গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেন।
দুই ঘণ্টাব্যাপী এই কর্মসূচিতে নিয়ন্ত্রিত প্যানেল আলোচনা এবং উন্মুক্ত মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা ছিল পরামর্শমূলক ও অরাজনৈতিক, এবং এর গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হবে।
ঢাকা ফোরাম ইনিশিয়েটিভ জানায়, ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা এবং অংশীজনদের ধারাবাহিক সম্পৃক্ততায় এই গোলটেবিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গোলটেবিল আলোচনাটি সিকম লিমিটেড–এর সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের মিডিয়া পার্টনার ছিল দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।
-সাইমুন










