সীমান্তসহ ৫ বিভাগে দাঁড়িপাল্লার দাপট: ছাড় দেবে না জামায়াত

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজেদের শক্তির দুর্গ পুনদর্খল করতে এবং রাষ্ট্র সংস্কারের অংশীদার হতে দেশের পাঁচটি বিভাগ ও সীমান্তবর্তী আসনগুলোতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচনী কৌশল হিসেবে উত্তরাঞ্চল ও খুলনাকে প্রাধান্য দিয়ে আসন বণ্টন করেছে দলটি। ১০ দলের জোট থাকলেও জামায়াত তাদের শক্ত ঘাঁটিগুলোতে শরিকদের জন্য খুব কম আসনই বরাদ্দ রেখেছে।
জরিপ কী বলছে?
জামায়াতের নিজস্ব তিনটি জরিপ এবং কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে ‘দাঁড়িপাল্লা’।
  • রংপুর বিভাগ: ৩৩টি আসনের মধ্যে অন্তত ২৫টিতে জয়ের আশা করছে জামায়াত।
  • খুলনা বিভাগ: ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৪টিতেই এগিয়ে থাকার দাবি দলটির।
  • রাজশাহী বিভাগ: ৩৯টি আসনের মধ্যে ১৮টিতে শক্ত অবস্থান রয়েছে তাদের।
  • অন্যান্য: সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে ১০টি এবং চট্টগ্রাম বিভাগের ৫৮টির মধ্যে ২৩টিতে তাদের অবস্থান সুবিধাজনক। তবে ঢাকা (৭০ আসনে মাত্র ৪টি) এবং ময়মনসিংহ (২৪ আসনে মাত্র ৩টি) বিভাগে জামায়াত এখনো অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে।
সবল এলাকায় নিজে লড়বে জামায়াত: শরিকদের সামান্য ছাড়
জামায়াতের রণকৌশল হলো, যেখানে তাদের জয় নিশ্চিত বা সম্ভাবনা বেশি, সেখানে শরিকদের কোনো ছাড় না দেওয়া।
  • উত্তরাঞ্চল ও খুলনা: ১০ দলের জোট হলেও রংপুর বিভাগে মাত্র ৪টি এবং রাজশাহীতে মাত্র ৩টি আসন শরিকদের দেওয়া হয়েছে। খুলনার ৩৬টি আসনের মধ্যে ৩৫টিই নিজেদের হাতে রেখেছে জামায়াত।
  • সীমান্তবর্তী আসন: রংপুর বিভাগের ১৭টি সীমান্তবর্তী আসনের ১৪টিই নিজেদের হাতে রেখেছে তারা। রাজশাহী, খুলনা ও সিলেটেও একই নীতি অনুসরণ করা হয়েছে।
  • দক্ষিণ চট্টগ্রাম: এই অঞ্চলের ১০টি আসনের সবকটিতেই জামায়াত এককভাবে নির্বাচন করবে।
মধ্যাঞ্চল ও বরিশাল: যেখানে শরিকরাই ভরসা
যেসব এলাকায় জামায়াতের অবস্থান ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল, সেখানে শরিক দলগুলোকে বেশি আসন দিয়ে জোটবদ্ধ শক্তির প্রকাশ ঘটাতে চাইছে দলটি।
  • ঢাকা ও ময়মনসিংহ: এই দুই বিভাগের ৯৪টি আসনের মধ্যে মাত্র ৪২টি নিজেদের জন্য রেখে ৫২টি আসন শরিকদের ছেড়ে দিয়েছে জামায়াত। এর মধ্যে এনসিপিকে ১২টি এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১১টি আসন দেওয়া হয়েছে।
  • বরিশাল বিভাগ: ২১টি আসনের মধ্যে মাত্র ৬টিতে জামায়াত নির্বাচন করবে, বাকি ১৫টিই শরিকদের জন্য উন্মুক্ত বা বরাদ্দ।
নেতৃত্বের বক্তব্য: জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, “১৫ বছরের লড়াই-সংগ্রাম এবং ৫ আগস্ট পরবর্তী ভূমিকার কারণে জামায়াত এখন বড় দল। ‘দাঁড়িপাল্লা’ এখন অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতীক। আমাদের নিজস্ব শক্তির জায়গা যেমন উত্তরবঙ্গ ও খুলনা, তেমনি ঢাকা ও কুমিল্লাতেও আমরা দুর্বল নই।” তিনি আরও জানান, আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে তাদের জোটই এখন বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।
জোটের টানাপোড়েন 
গত বৃহস্পতিবার ২৫০ আসনে সমঝোতা ঘোষণা করা হলেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (চরমোনাই) জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় সমীকরণে নতুন মোড় নিয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের জন্য রাখা ৪৪টি আসনেও এখন জামায়াত বা এনসিপির প্রার্থী থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে জামায়াতের প্রার্থীর সংখ্যা শেষ পর্যন্ত ২২০ থেকে ২২৭ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, দাঁড়িপাল্লা এখন শক্তিশালী প্রতীক। ১৫ বছরের সংগ্রাম আর ৫ আগস্ট-পরবর্তী ইতিবাচক ভূমিকার কারণে মানুষ এখন জামায়াতকে বড় দল হিসেবে দেখছে। উত্তরবঙ্গ ও খুলনা আমাদের শক্তির জায়গা, তাই সেখানে আমরা কোনো ছাড় দেইনি।”
অতীতের সাফল্য ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
১৯৯১ সালে ১২.১ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৮টি আসন পাওয়া ছিল জামায়াতের সর্বোচ্চ সাফল্য। তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনে তারা সেই রেকর্ড ভাঙতে চায়। বিগত উপজেলা নির্বাচনে কারচুপির আগে প্রথম দুই ধাপে ৩৬টি উপজেলায় জামায়াতের জয়ই প্রমাণ করে তৃণমূল পর্যায়ে তাদের শক্ত ভিত্তি এখনো অটুট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে মূলত বিএনপি বনাম জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের লড়াই হবে। আর জামায়াতের এই আঞ্চলিক কৌশল তাদের সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন জেতার লক্ষ্যে এক বড় ধরণের রাজনৈতিক চাল।
লামিয়া আক্তার