একটা সময় ছিল পারিবারিক গল্পের কারণেই টিভি ধারাবাহিক জনপ্রিয় ছিল। নাটক দেখতে মা-বাবা, ভাই-বোন, ভাবি-দুলাভাই, দাদা-দাদি, নানা-নানিসহ পরিবারের প্রায় সব সদস্যই একসঙ্গে বসে ধারাবাহিক নাটক দেখতেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের [বিটিভি] সোনালি যুগে পারিবারিক গল্পের নাটক প্রচার হতো বেশি। টিভি পর্দায় এসব ধারাবাহিক নাটক দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ত দর্শক। ‘অয়োময়’, কোথাও কেউ নেই’, ‘সংশপ্তক’, ‘আজ রবিবার’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘সকাল-সন্ধ্যা’, ‘বন্ধন’ ‘রূপনগর’-এর মতো অসাধারণ কিছু কাজ ধারাবাহিকের কথা দর্শক আজও মনে রেখেছে।
চ্যানেল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে কমে আসে পারিবারিক গল্পের টিভি নাটক। দর্শক মুখ ফিরিয়ে নেয় দেশীয় নাটক থেকে। তারা বিদেশি সিরিয়ালের দিকে আগ্রহী হয়ে ওঠে। দেশীয় চ্যানেলগুলোও প্রচারে আনে বিদেশি সিরিয়াল। পারিবারিক গল্পের কারণেই দর্শকের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠে এসব সিরিয়াল।
আজ থেকে মুক্তি পাবে অসাধারণ পারিবারিক গল্পে তারকাবহুল ‘আঁতকা’। পারিবারিক গল্পের আবহে তৈরি এই সিরিজে দর্শকদের জন্য রাখা হয়েছে এক ভৌতিক গল্পের রহস্য। রাবা খানের গল্প ও চিত্রনাট্যে সিরিজটি পরিচালনা করেছেন আরাফাত মহসীন নিধি।
সিরিজটিতে অভিনয় করেছেন দেশের একঝাঁক জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী। বড়দের চরিত্রে আছেন আবুল হায়াত, রোজী সিদ্দিকী, সাবেরী আলম, তুষার খান ও মৌসুমী নাগের মতো গুণী শিল্পীরা। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে রয়েছেন আরশ খান, সুনেরাহ বিনতে কামাল, সোহেল মণ্ডল ও ফারিহা রহমানসহ আরও অনেকে।
দর্শকের মাঝে ভিনদেশি সিরিয়ালের পারিবারিক গল্পের আগ্রহীর দরুন দেশীয় টিভি চ্যানেল কর্তৃপক্ষও উদ্যোগ নেয় পারিবারিক ধারাবাহিকের। ফলে এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি পারিবারিক ধারাবাহিক নাটক প্রচার হচ্ছে বিভিন্ন চ্যানেলে। দর্শকপ্রিয়তার কারণে কোনো কোনো নাটকের সিক্যুয়ালও তৈরি করা হচ্ছে। একটি শেষ হতে না হতেই শুরু হচ্ছে আরেকটি নাটক। হারিয়ে যাওয়া সেই পারিবারিক আবহ দেখে আবারও আশাবাদী হয়ে উঠেছেন দর্শক। নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীরা এখন এসব নাটকে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। অনেকটা জোয়ার বইছে পারিবারিক নাটকের। গল্প তো বটেই খোদ নাটকের নামকরণ হচ্ছে পরিবার নিয়ে। বছর দুয়েকের মধ্যে ‘ফ্যামিলি ক্রাইসিস’, ‘জয়েন্ট ফ্যামিলি’, ‘ফ্যামিলি ফ্যান্টাসি’, ‘ফ্যামিলি প্রবলেম’, ‘ ফ্রেন্ডস ফ্যামিলি’, ‘পরিবার : দ্য ফ্যামিলি’, ‘হইচই পরিবার’সহ আরও অনেক নাটক। এছাড়া আমাদের বাড়ি, মা-বাবা-ভাই বোনসহ আরও কিছু নাটকে দেখা যাচ্ছে বাঙালি পরিবারের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার গল্প। সম্প্রতি সিনেমা ওয়ালা ইউটিউব চ্যানেলে প্রচারিত হচ্ছে পারিবারিক গল্পের নাটক ‘এটা আমাদেও গল্প’।
অভিনেতা আবুল হায়াতের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বললে তিনি জানান, দর্শক পারিবারিক নাটক পছন্দ করেন। পরিবারের সবাই মিলে এ নাটক দেখতে পারেন। করোনার শুরুর দিকে অনেক আগের নাটকগুলো পুনঃপ্রচার হয়েছে। দর্শক নাটকগুলো দেখেছেন। বর্তমানে আমরা পরিবার থেকে সরে যাচ্ছি। পারিবারিক জীবনের প্রতি মানুষের যে আকর্ষণ ছিল, সেটা আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। তবে এখন কিছু পরিচালক পারিবারিক গল্পের নাটক নির্মাণে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এটা অত্যন্ত ভালো খবর। এটা অব্যাহত থাকা দরকার।’
পারিবারিক গল্পের কারণেই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল ধারাবাহিকগুলো। লম্বা একটা সময় ধরে ছিল পারিবারিক গল্পের রাজত্ব। এরপর চলা শুরু হলো প্রেমের গল্পের নাটকের। এসব নাটকে নায়ক নায়িকার বাইরে তেমন কোনো চরিত্র দেখা যেত না। এ ধরনের নাটক বেশি নির্মিত হওয়ায় অনেক গুণী অভিনয়শিল্পীরা কাজ হারাচ্ছিলেন। পাশাপাশি কমেডি নাটকেরও আধিক্য ছিল। ইদানীং পারিবারিক গল্পে ফিরছে একক ও ধারাবাহিক নাটক। এখন প্রায় চ্যানেলেই প্রচার হচ্ছে পারিবারিক গল্পের নাটক। এমনটিই জানিয়েছে নাটক সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘদিন পর পারিবারিক আবেগ ও সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে নির্মিত কোনো ধারাবাহিক নাটক নিয়ে দর্শক মহলে ব্যাপক উন্মাদনা দেখা যাচ্ছে। সেটি হলো- জনপ্রিয় নির্মাতা মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজের পরিচালিত ‘এটা আমাদেরই গল্প’। ইউটিউবে গেলেই দেখা যায়, ১০-১৫ মিলিয়নের ওপরে ভিউ প্রায় প্রতিটি পর্বেই; একেকটি পর্ব মুক্তির একদিনেই গড়ছে ভিউয়ের রেকর্ড।
এছাড়াও সামাজিক মাধ্যমেও আলোচনায় এই ধারাবাহিক। বিশেষ করে নাটকের বিভিন্ন সংলাপ ও আবেগঘন দৃশ্যগুলো প্রতিনিয়ত ভাইরাল হচ্ছে ফেসবুকে। সামির, মেহরিন, ফাহাদ বা আঞ্জুমান বেগমের মতো চরিত্রগুলো যেন দর্শকদের কাছে এখন ঘরের মানুষ হয়ে উঠেছে।
নাটকটির জনপ্রিয়তা প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, পরিবারের বন্ধন, ভালোবাসা, দ্বন্দ্ব আর মমত্ববোধই এই গল্পের প্রাণ। ‘পরিবারই শুরু, পরিবারই শেষ’, এই ট্যাগলাইনকে সামনে রেখে নির্মিত গল্পটিতে দর্শকরা তাদের নিজেদের জীবনের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাচ্ছেন বলেই এটি এত দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছে।
তারকাখচিত এই সিরিয়ালে অভিনয় করেছেন ইরফান সাজ্জাদ, কেয়া পায়েল, খায়রুল বাসার, সুনেরাহ বিনতে কামাল, ইন্তেখাব দিনার, দীপা খন্দকার, মনিরা আক্তার মিঠুসহ একঝাঁক জনপ্রিয় শিল্পী। ‘সিনেমাওয়ালা’ ইউটিউব চ্যানেলে দেখা যাচ্ছে এই ধারাবাহিকের পর্বগুলো।
গায়মা জান্নাত নামের এক দর্শক মন্তব্য করেছেন, আমি এটা আমাদের গল্পের প্রত্যেকটি পর্ব আমি দেখি। গল্পে জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত, সম্পর্ক ও আবেগের জটিলতা ভালো লাগল। পরিবার, বন্ধু ও সামাজিক বন্ধনের নানা দিক নাটকে জীবন্তভাবে ফুটে উঠেছে। গল্পের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ্য।’
এ্ই নাটকের অভিনেতা খায়রুল বাসার আলোকিত স্বদেশকে বলেন,‘দর্শক এই গল্প লুফে নিচ্ছেন। কারণ, তাঁরা এটা আমাদেরই গল্পর সঙ্গে নিজের পরিবার ও পরিবারের সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক-ক্রাইসিস রিলেট করতে পারছেন।’
সুনেরাহ্ বিনতে কামাল বলেন, ‘ যেখানেই যাচ্ছি, কেউ না কেউ নাটকটি নিয়ে, আমার অভিনয় নিয়ে প্রশংসা করছে। আমাকে অনেকেই এখন সায়রা (নাটকের চরিত্র) বলে ডাকে। মজা লাগে।’










