রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে পর্যটকবাহী নৌ-যান দুর্ঘটনায় বারবার প্রাণহানি ও নিরাপত্তার চরম সংকটের বিষয়টি এবার আদালতের নজরে এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) রাঙামাটির জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসিফ আলম চৌধুরী ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী স্বপ্রণোদিত (সুয়োমোটো) হয়ে নৌ-পুলিশকে এ বিষয়ে বিস্তারিত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
গত ২৫ ডিসেম্বর কাপ্তাই হ্রদে পর্যটক নিয়ে নৌকাডুবির ঘটনার পর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের সূত্র ধরে আদালত এই আদেশ দেন। বিশেষ করে ‘কাপ্তাই হ্রদে পর্যটক নিয়ে চলে দেড় শতাধিক অবৈধ নৌযান, ঘটছে দুর্ঘটনা’ শীর্ষক সংবাদের প্রেক্ষিতে আদালত জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং রিসোর্ট মালিকদের চরম উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আদালত মন্তব্য করেন, এই ধরনের অবহেলা সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত মানুষের ‘জীবন রক্ষার অধিকারের’ পরিপন্থী।
আদালত তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেন, প্রতিটি নৌ-দুর্ঘটনার মূলে একটি সাধারণ কারণ স্পষ্ট—আর তা হলো লাইফ জ্যাকেটের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। রিসোর্ট ও নৌ-যান মালিকদের কঠোর সমালোচনা করে আদালত বলেন, পর্যটকদের জীবনের প্রতি তাঁদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। পাশাপাশি বিআইডব্লিউটিএ (BIWTA), নৌ-পুলিশ এবং টুরিস্ট পুলিশ কাপ্তাই হ্রদে নিয়মিত তদারকি করতে ব্যর্থ হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আদালত নৌ-পুলিশকে নির্দিষ্ট সাতটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছেন: ১. ২৫ ডিসেম্বরের দুর্ঘটনায় নৌকা মালিক ও চালকের অবহেলা ছিল কি না। ২. নৌযানটির বৈধ রেজিস্ট্রেশন বা লাইসেন্স ছিল কি না। ৩. ১৯ জন যাত্রীর জন্য পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছিল কি না। ৪. নৌকার ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হয়েছিল কি না। ৫. চালক প্রশিক্ষিত এবং বৈধ লাইসেন্সধারী কি না। ৬. চালকের অদক্ষতা বা অসাবধানতা দুর্ঘটনার কারণ কি না। ৭. বর্তমানে কাপ্তাই হ্রদে কতটি নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত নৌযান চলাচল করছে।
রাঙামাটি কোর্ট পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক তাজউদ্দিন আদালতের এই নির্দেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আদালতের আদেশের কপি সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো হয়েছে এবং দ্রুতই তদন্ত কার্যক্রম শুরু হবে।
কাপ্তাই হ্রদে প্রতি বছর পর্যটন মৌসুমে ছোট-বড় অনেক দুর্ঘটনা ঘটলেও স্থায়ী কোনো সমাধান আসেনি। লাইসেন্সবিহীন নৌযান এবং অদক্ষ চালকদের দাপট হ্রদটিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। স্থানীয়রা মনে করছেন, আদালতের এই সরাসরি হস্তক্ষেপ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনবে এবং হ্রদে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে।
-এম. এইচ. মামুন










