আগামী ১৩ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইশতেহার তৈরিতে বড় চমক নিয়ে আসছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ‘পরিবর্তনের রাজনীতি’ স্লোগানকে সামনে রেখে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ‘৩১ দফা’ এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদে’র সমন্বয়ে আটটি বিশেষ খাতের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে এই ইশতেহার।
বিএনপির নীতিনির্ধারক ও ইশতেহার প্রণয়ন সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং স্বাস্থ্য-শিক্ষাসহ আটটি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার থাকছে, যা নির্বাচনি লড়াইয়ে নতুন ‘ডাইমেনশন’ যোগ করবে।
ইশতেহারের ৮ মূল স্তম্ভ:
১. ফ্যামিলি কার্ড: সরকারে গেলে বিএনপি প্রতিটি পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করবে। এর মাধ্যমে পরিবারগুলো মাসে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা সমমূল্যের খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাশ্রয়ী মূল্যে পাবে। এটি নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখবে।
২. কৃষক কার্ড: কৃষকদের জন্য থাকবে বিশেষ কার্ড, যার মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে সার, উন্নত বীজ ও কৃষিপ্রযুক্তি সরবরাহ করা হবে। কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাজার সংযোগ তৈরি করা হবে।
৩. স্বাস্থ্যসেবা: প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে শক্তিশালী ‘প্রাইমারি হেলথ কেয়ার নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলা হবে। পর্যায়ক্রমে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে, যার ৮০ শতাংশই হবেন নারী।
৪. শিক্ষা: মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে চাহিদাভিত্তিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হবে। শিক্ষকদের আর্থিক সুরক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষেত্রের সাথে শিক্ষার সরাসরি সংযোগ তৈরি করা হবে।
৫. ক্রীড়া: খেলাধুলাকে স্কুল-কলেজে বাধ্যতামূলক করা হবে। পর্যাপ্ত ক্রীড়া শিক্ষক ও প্রশিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করা হবে।
৬. পরিবেশ: নবায়নযোগ্য শক্তি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জোর দেওয়া হবে। এছাড়া জলবদ্ধতা নিরসন ও কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সারা দেশে ২৫ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী খনন ও পুনঃখনন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
৭. কর্মসংস্থান: আইসিটি, ব্লু ইকোনমি, এসএমই এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে। পাশাপাশি বিদেশে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির নতুন বাজার খোঁজা হবে।
৮. ধর্মীয় নেতাদের উন্নয়ন: প্রতিটি মসজিদের খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য ধর্মের পুরোহিত ও পাদরিসহ ধর্মীয় নেতাদের জন্য মাসিক সম্মানীর ব্যবস্থা করা হবে।
নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য:
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো শক্তিশালী করাই আমাদের প্রধান অঙ্গীকার। বিএনপি এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় না যা বাস্তবায়ন করতে পারবে না। জনগণের জন্য ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনাই এই ইশতেহারে প্রতিফলিত হবে।”
স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম জানান, মানুষের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পরিবর্তনের রাজনীতির এই রূপরেখা ভোটারদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করবে।
প্রচার কৌশল ও বিশ্লেষণ:
ইশতেহারের এই প্রতিশ্রুতিগুলো জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে বিএনপি ইতিমধ্যে পাঁচটি বিশেষ টিম গঠন করেছে। তারা ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারদের এই পরিকল্পনাগুলো বুঝিয়ে দেবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ইউরোপীয় আদলে যে সুবিধার কথা বিএনপি বলছে, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও উচ্ছ্বাস তৈরি করবে। অভাবগ্রস্ত মানুষের জন্য এ ধরনের রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাওয়ার প্রতিশ্রুতি ভোটের মাঠে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিএনপির এই ইশতেহারে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, বাক-স্বাধীনতা এবং জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের মতো বিষয়গুলোও বিশদভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকছে।










