রায়েরবাজারে জুলাই এর অজ্ঞাত শহীদদের ৮ লাশ শনাক্ত

ছেলের কবর দেখে কাঁদছে শহীদ সোহেল রানার ভাই ও মা।

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে গণহত্যার পর অজ্ঞাতনামা হিসেবে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন হওয়া শহীদদের মধ্যে প্রথম ধাপে ৮ জনের লাশ শনাক্ত করা হয়েছে। দাফন করা ১১৪ জন শহীদকে দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছিল। অবশেষে বিদেশি ফরেনসিক টিম ও সিআইডির উদ্যোগে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে এই শনাক্তকরণ সম্পন্ন হয়েছে।

সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার সকাল ৯টায় রায়েরবাজার কবরস্থানে শনাক্ত শহীদদের কবরের শেষ আশ্রয়স্থল পরিবারের কাছে হস্তান্তরের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনাক্ত হওয়া শহীদদের মধ্যে রয়েছেন- শহীদ ফয়সাল সরকার, শহীদ পারভেজ বেপারী, শহীদ রফিকুল ইসলাম (৫২), শহীদ মাহিম, শহীদ সোহেল রানা, শহীদ আসাদুল্লাহ, শহীদ কাবিল হোসেন এবং শহীদ রফিকুল ইসলাম (২৯)।

শনাক্তকৃত শহীদদের তালিকা।

৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে রায়েরবাজারে শনাক্ত হওয়া ৮ জনের মরদেহ পরিবারদের কাছে হস্তান্তর অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। এই অনুষ্ঠানে শনাক্ত মরদেহগুলো তাদের আইনগত ও ফরেনসিক প্রক্রিয়া শেষে পরিবারগুলোর কাছে হস্তান্তর বিষয়ে সরকারি বিবৃতি দেয়া হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সরকারের প্রেস সচিব শফিকুল আলম, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম, সিআইডির প্রতিনিধিরা (যারা ডিএনএ শনাক্তকরণ ও ফরেনসিক প্রক্রিয়ার কাজ করেছেন), শনাক্ত হওয়া ৮ জন শহীদের পরিবারের সদস্যরা প্রমুখ।

 

কবর হস্তান্তর অনুষ্ঠানের মঞ্চ।

 

সেখানে উপস্থিত শহীদ আসাদুল্লাহ (৩১) এর স্ত্রী ফারজানা আক্তার বলেন, “দেড় বছর দীর্ঘ অপেক্ষা এবং অনেক ছুটাছুটির পর অবশেষে আমরা তার কবরটা দেখতে পেরেছি। সরকার যদি ৫ আগস্টের পরপরই এই উদ্যোগটা নিতো তাহলে হয়তো আমরা মানুষটার দেহটা দেখতে পারতাম, এখন তো হাড় ছাড়া কিচ্ছু নাই।”

 

সন্তানের কবরের উপরে কাঁদছে মা।

এরপরে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে এই প্রথম এতোগুলা কবর একসাথে শনাক্ত হয়েছে। এতো বড় কাজটা করার জন্য সিআইডিসহ অনেকের অনেক পরিশ্রম এবং অবদান রয়েছে। তারা না থাকলে হয়তো আমরা কখনোই আমাদের স্বজনের কবরটা বুঝে পেতাম না”।

 

শহীদ সোহেল রানার ভাই মোঃ আলভী নাবিল হোসেন বলেন, “২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন সময় আমাদের ভাইদের কে খুনি হাসিনার নির্দেশে, রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের ৪ নম্বর ব্লকে ওয়ারিশ থাকা সত্বেও অজ্ঞাত পরিচয়ে বেওয়ারিশ ভাবে দাফন করা হয়েছিল।“

 

অনুষ্ঠানে শনাক্তকৃত শহীদদের পরিচয় সম্বলিত ব্যানার।

তিনি আরও বলেন, “আমরা যখন জানতে পারি আমার ভাই বীর শহীদ মোঃ সোহেল রানা ভাইয়াসহ ১১৪ জন কে অজ্ঞাতক পরিচয়ে বেওয়ারিশ ভাবে দাফন করা হয়, তখন থেকে আমাদের ভাইদের লাশ শনাক্ত করার জন্য আমরা দীর্ঘদিন যাবত অনেক লড়াই করেছি। দেড় বছর পরে ইন্টেরিম, আমাদের ভাইদের  শনাক্তর জন্য বিদেশ থেকে ফরেনসিক টিম নিয়ে আসে আর তারা কাজ শুরু করে। অবশেষে আমাদের ভাইদের লাশ ডিএনএ টেস্ট এর মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়।“

তিনি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বলেন, “আমাদের ভাইদের কবরের শেষ আশ্রয়স্থল এর জায়গাটা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য যারা আমাদেরকে সাহায্য করেছেন, তাদের সবাইকে অনেক ধন্যবাদ।“

এই দেড় বছরে ডেথ সার্টিফিকেট না পাওয়ার কারণে অজ্ঞাত শহীদরা শহীদের মর্যাদা পাননি। অবশেষে শনাক্তকৃত শহীদরা শহীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছে।

শহীদদের স্থানান্তর করার পর তাদের কবর।

সিআইডি এর প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগত উল্লাহ জুলাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে নিহত অজ্ঞাত মরদেহগুলোর উত্তোলন, ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ শনাক্তকরণ কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা অজ্ঞাত শহীদদের মরদেহ উত্তোলন শেষে তাদের ডিএনএ স্যাম্পল কালেকশন করেছি। প্রাথমিকভাবে আমরা ৮ জন শহীদ পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে তাদের ডিএনএ স্যাম্পল নেওয়ার পর তাদের কবরগুলো শনাক্ত করে পরিবারের সদস্যদের কাছে বুঝিয়ে দিয়েছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা অন্যান্য অজ্ঞাত শহীদদের পরিবারের আবেদন প্রেক্ষিতে বাকিদের শনাক্ত করে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করব। এছাড়াও, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় যেসব মরদেহ কবর দেওয়া হয়েছে, তাদের ডিএনএ কালেকশনের পর প্রায় সবার শরীরে গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে।’

‎তিনি জানান, “জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ১৪ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ১১৪ জনের মরদেহ আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম গণকবরে দাফন করা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ১১৪ জনের মরদেহের মধ্যে সদ্য জন্ম নেওয়া মরদেহ থেকে শুরু করে ভবঘুরেসহ মোট ১১৪ জনের অজ্ঞাত মরদেহ দাফন করা হয়। আমরা এ ১১৪টা মরদেহ উত্তোলন করে ডিএনএ স্যাম্পল কালেকশন করি। এদের মধ্যে আমাদের কাছে ৯ জন শহীদ পরিবারের সদস্যরা আবেদন করে। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আমরা ৮ জনের কবরগুলো শনাক্ত করে পরিবারের কাছে কবরগুলো বুঝিয়ে দিয়েছি। এ ৯ জনের মধ্যে একজনের ডিএনএ শনাক্ত না হওয়ায় আমরা তার কবর হস্তান্তর করতে পারিনি।“

শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, “মিনেসোটা প্রটোকল অনুসরণ করে ১১৪ জন শহীদের লাশ উত্তোলন ও ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। প্রথম ধাপে শনাক্ত ৮ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। আরও একজনের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া চলছে। এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন অভিযান।”

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম (বীর প্রতীক) বলেন, “পরিবাররা অবশেষে জানতে পারছেন তাদের প্রিয়জন কোথায় শায়িত। এটা তাদের জন্য এবং জাতির জন্য মানসিক শান্তির বড় কারণ।”

এই কাজ বাস্তবায়নে আরো কাজ করেছে আইটিজেপি (ইন্টারন্যাশন ট্রুথ এন্ড জাস্টিস প্রোজেক্ট) এবং ব্লাস্ট (বাংলাদেশ লীগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্ট)। আইটিজেপির এই “মিসিং পারসন” প্রোজেক্টের সমন্বয়ক তাজওয়ারুল ইসলাম বলেন, “আজ ৮ জন শহীদের পরিচয় ফিরিয়ে দেওয়া এবং তাঁদের মরদেহ পরিবারের নিকট হস্তান্তর করতে পেরে আমরা গভীর তৃপ্তি বোধ করছি। এটি শহীদদের প্রতি জাতির একটি দায়বদ্ধতা পালনের অংশ। এই প্রকল্পে শুরু থেকেই আইটিজেপি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। বাকি শহীদদের পরিচয় শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।”

ব্লাস্টের এই প্রকল্পের আইনজীবী সুষ্মিতা চক্রবর্তী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অজ্ঞাতনামা ১১৪জন শহীদের মরদেহ উত্তোলনপূর্বক ডিএনএ পরীক্ষা ও ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়ায় ব্লাস্ট আইনী সহায়তা দিয়েছে। আমরা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই যে মরদেহ উত্তোলন করে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে অবশেষে শহীদদের লাশ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, যা সত্যিই একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মানবিক উদ্যোগ। যদি এই কাজটা আরো আগে করা সম্ভব হতো তাহলে শহীদ পরিবাররা আরো যথাযথভাবে এবং মর্যাদার সাথে তাদের স্বজনদের শ্রদ্ধা জানাতে পারতেন। আমাদের ধারণা সরকারী বিভিন্ন জটিলতা এবং বিশেষজ্ঞ টীম বিলম্বে আসার কারণে এই প্রক্রিয়াটিতে সময় লেগেছে। তবে আমরা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।”

উল্লেখ্য, বিদেশি ফরেনসিক টীম বাংলাদেশে আসার পর ৭ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে গণকবর খুঁড়ে ১১৪টি লাশ উত্তোলন করা হয়। এরপর জুলাই এ নিখোঁজ ব্যক্তিদের কাছ থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে সেগুলো লাশ শনাক্ত করতে ব্যবহার করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৮টি লাশ শনাক্ত করে সেগুলো কবরে স্থানান্তর করে ৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে পরিবারের কাছে কবর বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

লাশ উত্তোলন ও শনাক্তকরণে বিদেশি দলের নেতৃত্বে আছেন ড. লুইস ফন্ডেব্রাইডার, একজন আন্তর্জাতিক ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও অ্যান্থ্রোপোলজিস্ট। তিনি পুরো ডিএনএ মিল এবং ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছেন এবং Minnesota Protocol অনুযায়ী বাংলাদেশে এই বিরল ধরনের ফরেনসিক অভিযান বাস্তবায়ন করছেন।

ড. মরিস টিডবল-বিনজ, বিশ্বখ্যাত ফরেনসিক বিজ্ঞানী ও চিকিৎসক, সিআইডির ফরেনসিক ও ডিএনএ টিমকে দুই দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, যাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সম্পন্ন করা যায়।

এই প্রকল্পে জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থা (UNHCR / UN Human Rights Council) সহযোগী সংস্থা হিসেবে ভূমিকা রাখছে। তারা প্রক্রিয়া পরিকল্পনা ও ফরেনসিক পরামর্শ দিয়ে নিশ্চিত করছেন যে শনাক্তকরণ মানবিক ও বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডের সঙ্গে সম্পন্ন হচ্ছে।

মালিহা নামলাহ