রাজনীতির মঞ্চে তিনি একজন নেতা, হাজার মাইল দূর থেকে বিএনপির মত একটি বিশাল রাজনৈতিক দলের হাল ধরে রাখা এক কাণ্ডারি। কিন্তু দিনশেষে তিনিও একজন সন্তান। মা বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে তারেক রহমানের হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ, তা কেবল ক্ষমতার সমীকরণ বা দলীয় রাজনীতির ফ্রেমে মাপা সম্ভব নয়। এই মৃত্যু তাঁর জন্য কেবল একজন অভিভাবকের প্রস্থান নয়, বরং এক দীর্ঘ লড়াইয়ের শেষ আশ্রয়ের বিলীন হয়ে যাওয়া।
“আমার মা, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, সর্বশক্তিমান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে আজ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।” সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মঙ্গলবার দুপুর ২টা ৩ মিনিটে এভাবেই নিজের মায়ের মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত তারেক রহমান।
তারেক রহমানের জন্য এই শোক দ্বিগুণ ভারী হয়ে এসেছে দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময়ের বিচ্ছেদের কারণে। লন্ডনের নির্বাসিত জীবনে মায়ের সাথে তাঁর দেখা হয়নি বছরের পর বছর। ফোনের ওপ্রান্তের কণ্ঠস্বরই ছিল একমাত্র সম্বল। যে মা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অনুপ্রেরণা, যাঁর হাত ধরে তিনি রাজনীতির অলিগলি চিনেছেন, সেই মায়ের অন্তিম সময়ে পাশে থাকতে না পারার যে হাহাকার, তা তারেক রহমানের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজের শোকবার্তায় মর্মস্পর্শী হয়ে ফুটে উঠেছে।
ফেসবুকে তারেক রহমান তাঁর পোস্টে বলেন, “অনেকের কাছে তিনি ছিলেন দেশনেত্রী, আপোষহীন নেত্রী; অনেকের কাছে গণতন্ত্রের মা, বাংলাদেশের মা। আজ দেশ গভীরভাবে শোকাহত এমন একজন পথপ্রদর্শককে হারিয়ে, যিনি দেশের গণতান্ত্রিক পথযাত্রায় অনিঃশেষ ভূমিকা রেখেছেন। আমার কাছে খালেদা জিয়া একজন মমতাময়ী মা, যিনি নিজের সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছেন দেশ ও মানুষের জন্য। আজীবন লড়েছেন স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে; নেতৃত্ব দিয়েছেন স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে।
তারেক রহমানের কাছে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন অদম্য সাহসের প্রতীক। ওয়ান-ইলেভেনের দুঃসময় থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রতিটি রাজনৈতিক সংকটে, যখনই তিনি বাধাগ্রস্ত হয়েছেন, মায়ের অবিচল চাহনি আর সংকল্প তাঁকে পথ দেখিয়েছে। মায়ের মৃত্যুতে তারেক রহমান আজ আক্ষরিক অর্থেই এক ‘এতিম’ রাজনৈতিক সত্তা। বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন মা নন, তিনি ছিলেন তারেক রহমানের আদর্শিক বাতিঘর। এই শূন্যতা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে যেমন অপূরণীয়, তেমনি তাঁর রাজনৈতিক দর্শনেও এক বিশাল গহ্বর তৈরি করেছে।
তিনি আরও বলেন। “ত্যাগ ও সংগ্রামে ভাস্বর হয়েও, তিনি ছিলেন পরিবারের সত্যিকারের অভিভাবক; এমন একজন আলোকবর্তিকা যাঁর অপরিসীম ভালোবাসা আমাদের সবচেয়ে কঠিন সময়েও শক্তি ও প্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি বারবার গ্রেফতার হয়েছেন, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, সর্বোচ্চ নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। তবুও যন্ত্রণা, একাকিত্ব ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকেও তিনি অদম্য সাহস, সহানুভূতি ও দেশপ্রেম সঞ্চার করেছিলেন পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মাঝে। দেশের জন্য তিনি হারিয়েছেন স্বামী, হারিয়েছেন সন্তান। তাই এই দেশ, এই দেশের মানুষই ছিল তাঁর পরিবার, তাঁর সত্তা, তাঁর অস্তিত্ব। তিনি রেখে গেছেন জনসেবা, ত্যাগ ও সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিক্রমায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আপনারা সবাই আমার মা’র জন্য দোয়া করবেন। তাঁর প্রতি দেশবাসীর আবেগ, ভালোবাসা ও বৈশ্বিক শ্রদ্ধায় আমি ও আমার পরিবার চিরকৃতজ্ঞ। ”
তারেক রহমান তাঁর ফেসবুক প্রতিক্রিয়ায় আবেগ সামলে নিয়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানালেও, তাঁর ব্যক্তিগত বিষাদ আড়াল করা কঠিন। তিনি জানেন, খালেদা জিয়া কেবল তাঁর মা ছিলেন না, ছিলেন কোটি মানুষের ‘দেশমাতা’। মায়ের আদর্শকে বয়ে নিয়ে যাওয়াই এখন তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক। দলীয় নেতা-কর্মী, সমর্থক এবং সাধারণ মানুষ তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারেক রহমান দেশবাসীর কাছে মায়ের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া চেয়েছেন এবং শোক ও ভালোবাসার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
-এম. এইচ. মামুন










