খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশ শোকাহত; বিশ্বজুড়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি ও শোকবার্তা প্রবাহিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশের প্রথম নারী সরকারপ্রধান খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিশ্বজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিভিন্ন দেশের নেতারা তাঁর মৃত্যুতে গভীর দুঃখ প্রকাশ করে দেশ ও গণতন্ত্রের জন্য তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করেছেন।
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর মঙ্গলবার ঢাকার একটি হাসপাতালে খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে “গভীর শোক” প্রকাশ করেন। তিনি খালেদা জিয়াকে “গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র, বহুদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর সংগ্রাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি জানান, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিনি গভীরভাবে শোকাহত ও ব্যথিত।
খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও শোক প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁর দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অনলাইনে প্রকাশিত এক বার্তায় শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে খালেদা জিয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক জীবন ও বিএনপির নেতৃত্বের জন্য এক গভীর ক্ষতি।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর দুঃখ প্রকাশ করে তাঁর পরিবার ও বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার অবদান এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেগম জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন একজন বিশিষ্ট জননেত্রী। এক্স (সাবেক টুইটার)-এ দেওয়া এক পোস্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন, “বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিশিষ্ট জননেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে গভীরভাবে মর্মাহত। তাঁর পরিবার, বন্ধু ও অনুসারীদের প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা।”
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়ে তাঁকে “পাকিস্তানের একজন নিবেদিতপ্রাণ বন্ধু” হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে খালেদা জিয়ার আজীবন অবদান একটি স্থায়ী উত্তরাধিকার রেখে গেছে। শোকের এ সময়ে পাকিস্তানের চিন্তা ও প্রার্থনা খালেদা জিয়ার পরিবার এবং বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে রয়েছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি শোকবার্তা জানিয়ে বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আজীবন জনসেবার এক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন।
এদিকে ঢাকায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসও খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর সমবেদনা জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে দূতাবাস বলেছে, খালেদা জিয়া বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং দেশের উন্নয়নে তাঁর নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের কাছে পাঠানো এক বিশেষ শোকবার্তায় শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শোকবার্তায় ওয়াং ই বেগম খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের একজন ‘বর্ষীয়ান রাজনীতিক’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া চীনের প্রতি অত্যন্ত বন্ধুভাবাপন্ন ছিলেন এবং দুই দেশের সম্পর্কের বিকাশে সবসময় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।” চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্মরণ করেন যে, খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্ব, সমতা ও পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে ‘সর্বাঙ্গীণ সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। চীন সরকার দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে তাঁর এই ঐতিহাসিক অবদানকে অত্যন্ত উচ্চমূল্য দেয়।
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। লি কিয়াং লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদে আমি গভীরভাবে শোকাহত। চীন সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকার এবং খালেদা জিয়ার পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা ও আন্তরিক সহানুভূতি জানাচ্ছি।’
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ইরান ও গভীর শোক প্রকাশ করেছে । শোকবার্তায় বলা হয়, “খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নেত্রী। এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। খালেদ জিয়া গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও বাংলাদেশের জনজীবনে রেখেছেন উল্লেখযোগ্য অবদানও।”
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশনও। বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশন পৃথক পৃথক বার্তায় এই শোক জানিয়েছে।
ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) মিশন বাংলাদেশের জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছে। ইইউ জানিয়েছে, “বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও নেতৃত্ব বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিশেষ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
ঢাকায় অবস্থিত ফরাসি দূতাবাস এক শোকবার্তায় জানিয়েছে, “দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বেগম খালেদা বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এই শোকের সময় তার পরিবার, রাজনৈতিক দল এবং বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আমাদের সমবেদনা। তার স্থায়ী প্রভাব স্মরণীয় থাকবে।”
যুক্তরাজ্য হাইকমিশনও গভীর শোক প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে, “বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আমরা অত্যন্ত দুঃখিত।”
অস্ট্রেলিয়া হাইকমিশন বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে। এক বার্তায় তারা লিখেছে, “সাবেক প্রধানমন্ত্রী, নেত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আমাদের চিন্তা ও সমবেদনা বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে রয়েছে।”
জার্মান দূতাবাস বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে গভীর শোক প্রকাশ করছে। শোক বিবৃতিতে জার্মান দূতাবাস লিখেছে “দীর্ঘ জনজীবনে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আমরা তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের কথা স্মরণ করছি, যার মধ্যে রয়েছে ২০০৪ সালে ঢাকায় তৎকালীন জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়শকা ফিশারের সঙ্গে বৈঠক এবং ২০১১ সালে জার্মান প্রেসিডেন্ট ক্রিশ্চিয়ান উলফের রাষ্ট্রীয় সফরের সময় তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ। তিনি অন্যান্য উচ্চপর্যায়ের জার্মান প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। এই শোকের মুহূর্তে আমরা তাঁর জাতীয় জীবনে অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই এবং তাঁর পরিবার, দল ও বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আমাদের সমবেদনা প্রকাশ করছি। জার্মানি বাংলাদেশ ও জার্মানির মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব বজায় রাখার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা প্রার্থনা করি, তিনি শান্তিতে বিশ্রাম নিন।”
জাতিসংঘ বাংলাদেশ মাননীয় বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছে। শোক বিবৃতিতে জাতিসংঘ বাংলাদেশ লিখেছে, “এই শোকাবহ উপলক্ষ্যে জাতিসংঘ সাবেক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরিবার ও স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে এবং বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের সঙ্গে সংহতি পুনর্ব্যক্ত করছে।”
তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম প্রভাবশালী ও আলোচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগের অবসান ঘটাল।
এম এম সি/










