গীবত” একটি ভয়াবহ পাপ

গীবত একটি ভয়াবহ পাপ। সমাজে যেসব পাপের প্রচলন সবচেয়ে বেশী তন্মধ্যে গীবত অন্যতম। এই পাপটি নীরব ঘাতকের মতো। মানুষের অজান্তেই এটা তার নেকীর ভান্ডার নিঃশেষ করে দেয় এবং তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করে ছাড়ে। এটি চুরি-ডাকাতি, সূদ-ঘুষ, যিনা-ব্যভিচার ও মরা মানুষের পঁচা গোশত খাওয়ার চেয়েও মারাত্মক ও নিকৃষ্ট। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হ’ল এই জঘন্য পাপটি মানুষ হরহামেশাই করে থাকে। চায়ের আসর থেকে শুরু করে সোশাল মিডিয়া ও স্বাভাবিক আলাপচারিতায় এটা অনেকের স্বভাবসুলভ আচরণে পরিণত হয়ে গেছে।

মুসলিমদের গীবত ও তাদের মান-ইজ্জতে অহেতুক নাক গলানো এখন একটি জনপ্রিয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অথচ গীবত করতে আল্লাহ তা‘আলা কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। মানুষ যাতে গীবতকে ঘৃণা করে এবং তাতে নিরুৎসাহ হয় সেজন্য আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যাদেশ করেছেন। সর্বোপরি তিনি গীবতকে এমন ঘৃণ্যভাবে চিত্রিত করেছেন, যে কোনো মনই তার প্রতি বিতৃষ্ণ হবে।

“তোমরা কি জান ‘গীবত’ কী? তাঁরা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত। তিনি বললেন, তোমার ভাই যে কথা অপছন্দ করে তার সম্পর্কে সে কথা বলার নাম গীবত।

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন-

“মুমিনগণ, তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয় কতক ধারণা গোনাহ। এবং গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তারা মৃত ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুতঃ তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু”। (সুরা হুজরাত, আয়াত -১২)

আবূ বারযাহ আসলামী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা আমাদেরকে বক্তৃতার সময় বললেন : তোমাদের যাদের অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি অথচ মুখে ঈমান এনেছ, তোমরা মুসলিমদের দোষ-ত্র“টি খুঁজে বের করো না। যে ব্যক্তি মুসলিমদের দোষ-ত্র“টির পেছনে লেগে থাকে আল্লাহ তা‘আলা তাকে ঘরের মধ্যেই অপমানিত করবেন। (আবূ দাঊদ হা. ৪৮৮২, সহীহ)

রাসুল স: বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার কাছে তার দুচোয়ালের মধ্যবর্তী স্থান ও দু’রানের মধ্যবর্তী স্থান সংরক্ষণের দায়িত্ব নেবে আমি তার জান্নাতের যাওয়ার দায়িত্ব নেব’। (সহীহ বুখারী হা. ৬৪৭৪)

অর্থ্যাৎ মানুষের মধ্যে যারা নিজেদের মুখ ও লজ্জাস্থানের হেফাজত আল্লাহর রাসুল (স:) তার জান্নাতের দায়ীত্ব নেবেন। অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা মুসলিম ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা, সম্মানহানি করা হারাম করেছেন এবং কারো প্রতি খারাপ ধারণা করবে তাও হারাম করেছেন। (সিলসিলা সহীহাহ হা. ৩৪২০)

গীবত করা যেমন মহাপাপ তেমনি খুশি মনে পরনিন্দা শোনাও পাপ। মহান আল্লাহ মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেন ‘তারা যখন অসার বাক্য শ্রবণ করে তখন যেন তা উপেক্ষা করে’ (ক্বাছাছ ২৮/৫৫)। ওলামায়ে কেরাম বলেন ، ‘গীবত শোনা এবং এর দিকে কান পেতে থাকা বৈধ নয়। গীবতকারী এবং গীবত শ্রবণকারী উভয়ই সমান পাপী’।

অপরের বাড়িতে উঁকি মেরে দেখাও দোষ খোঁজার অন্তর্ভুক্ত। হাদীসে বলা হয়েছে, কেউ বিনা অনুমতিতে কারোর ঘরে উঁকি মেরে দেখলে তার চোখ ফুটা করে দাও। (সহীহ বুখারী হা. ৫৯২৪)

অন্য বর্ণনায় এসেছে : যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের কথা শোনার জন্য কান খাড়া করে অথচ তারা তা অপছন্দ করে, কিয়ামতের দিন তার দুই কানে গলিত শিশা ঢালা হবে। (সহীহ বুখারী হা. ৭০৪২)

যদি নিন্দা করার পিছনে যুক্তিসঙ্গত বা শরী‘আত সম্মত কোন কারণ থাকে, তবে সেই গীবত করা মুবাহ বা জায়েয। যেমন- যুলুমের বিচার প্রাপ্তির জন্য শাসকের কাছে নালিশ করার সময় গীবত করা। কোন ব্যক্তি যদি মযলূম হয়ে বিচারকের কাছে গিয়ে বলে, ‘অমুক ব্যক্তি আমার টাকা আত্মসাৎ করেছে, আমার প্রতি যুলুম করেছে, আমার বাড়িতে চুরি করেছে ইত্যাদি। তবে এটা হারাম গীবতের অন্তর্ভুক্ত হবে না। অনুরূপভাবে আলেম বা মুফতীর কাছে কোন বিষয়ে ফৎওয়া নেওয়ার জন্য অন্যায়কারীর গীবত করা জায়েয। অবজ্ঞা করার উদ্দেশ্য না করে স্রেফ পরিচয় দেওয়ার জন্য কারো ত্রুটি বর্ণনা করা জায়েয। যেমন- কানা, কালো, খোড়া ইত্যাদি।

অতএব আমাদের সকলের উচিত এসব ঘৃণ্য আচরণ পরিহার করে সুন্দর, সুখী ও সমৃদ্ধশালী পরিবার ও সমাজ গঠন করা।

মামুন