দেশজুড়ে চরম অস্থিরতা- হামলা, ভাঙচুর, আগুন, লুটপাট

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানীসহ একাধিক জেলা ও উপজেলায় বিচ্ছিন্নভাবে এসব ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় প্রশাসন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। এর মধ্যে হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে রাজধানীর কেন্দ্রস্থল কারওয়ান বাজার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কয়েক শ গজের মধ্যে অবস্থিত দুটি পত্রিকা অফিস প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার-এ ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়েছে। এ ছাড়া ধানমন্ডির ছায়ানট ভবনে ব্যাপক হামলা ও ভাঙচুর চালায় উত্তেজিত জনতা। এতে লন্ডভন্ড হয়ে যায় বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি আবারও ভাঙচুর করা হয়। গতকাল দুপুর ১২টায় সরেজমিন দেখা যায়, ৩০-৪০ জন যুবক ৩২ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলায় অবস্থান করছে। ৮-১০টি হাতুড়ি দিয়ে এদের মধ্যে কয়েকজন বাড়িটির দেয়াল ভাঙছে। কেউ ইট নিচে ফেলছে, কেউ কেউ স্লোগান দিচ্ছে। এ সময় ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার, ইনকিলাব জিন্দাবাদ, আওয়ামী লীগের কেবলা, মুজিববাদের কেবলা; ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’ স্লোগান দেয়। এদিকে গতকাল সন্ধ্যার পর রাজধানীর উদীচী কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
এর বাইরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও আগুনের খবর পাওয়া গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে রাতের আঁধারে কিছু স্থানে যানবাহন, দোকানপাট ও স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। কোথাও কোথাও সরকারি-বেসরকারি সম্পদ ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত, ব্যবসাবাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব এবং সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এদিকে হাদির মৃত্যুর খবরে চট্টগ্রামে রাতভর বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা। পরে মহানগরের খুলশীতে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের কার্যালয় ও বাসভবনের মূল ফটক লক্ষ করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীরা। এ সময় ১২ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।একই সময়ে মেয়র গলিতে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর বাস ভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ১০টার পর থেকে এসব ঘটনা ঘটে। গতকাল ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনসংলগ্ন এলাকায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। এদিকে হাদি হত্যার বিচার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল থেকে এক্সকেভেটর দিয়ে রাজশাহী মহানগরী আওয়ামী লীগের কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে শুরু হয়ে কুমারপাড়ায় অবস্থিত কার্যালয়টি গুঁড়িয়ে দেওয়ার কাজ চলে ভোর সাড়ে ৩টা পর্যন্ত।
বান্দরবানে সাবেক পার্বত্যবিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈ সিংয়ের বাড়িতে আগুন দিয়েছে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। গতকাল দিনের প্রথম প্রহরে শহরের রাজার মাঠসংলগ্ন বীর বাহাদুরের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ সময় ওই বাড়িতে কেউ ছিল কি না জানা যায়নি। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে কুষ্টিয়া শহরের মজমপুর গেট এলাকায় প্রথম আলো অফিসে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়েছে। বিক্ষুব্ধ জনতা অফিসটির সাইনবোর্ড, একটি কক্ষের দরজা-জানালা এবং বিভিন্ন আসবাব ভাঙচুর করে। গতকাল ঝিনাইদহ শহরের পায়রা চত্বরে জুমার পর শতাধিক ছাত্র-জনতা জড়ো হতে থাকে। একপর্যায়ে তারা সজীব হোসেন নামে এক ছাত্রলীগ কর্মীকে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে। আবার ছাত্র-জনতা উত্তেজিত হয়ে ঝিনাইদহ শহরের হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সড়কে অবস্থিত যুবলীগ নেতা আশফাক মাহমুদ জনের মালিকানাধীন গার্মেন্ট পণ্যের দোকান ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এ ছাড়া গভীর রাতে ছাত্র-জনতা ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি, সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কনককান্তি দাসের বাস ভবনে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নি সংযোগ করে। পরে তারা ঝিনাইদহ শহরের শের-ই-বাংলা সড়কের ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো অফিসে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। প্রতিষ্ঠানটির স্থানীয় ডিলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, আওয়ামী লীগ নেতা মিজানুর রহমান মাসুম।

এ ছাড়া ছাত্র-জনতা জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টুর বাস ভবনে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে। হবিগঞ্জ শহরে ব্লকেড কর্মসূচি পালনসহ আওয়ামী লীগ অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নি সংযোগ করা হয়েছে। এ সময় পুরো শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগ নেতা, ব্লগার সুশান্ত দাসের মালিকানাধীন ‘দৈনিক আমার হবিগঞ্জ’ অফিসে হামলা চালানো হয়। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় বেশ কিছু দেশি অস্ত্র। পরে এগুলো পুলিশে হস্তান্তর করা হয়। পত্রিকাটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া হবিগঞ্জ আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে গিয়ে হামলা চালায় ছাত্র-জনতা। এ সময় অফিসটি ভাঙচুরের পাশাপাশি শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ম্যুরালে আগুন দেওয়া হয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জনবহুল এলাকায় টহল জোরদার করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনগণকে গুজবে কান না দিতে এবং শান্তি বজায় রাখতে আহ্বান জানানো হয়েছে। যে কোনো সন্দেহজনক তৎপরতার তথ্য সংশ্লিষ্ট থানায় জানানোর অনুরোধও করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অস্থিরতা নিরসনে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংলাপের পাশাপাশি কঠোর আইনি ব্যবস্থা জরুরি।

পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বলে তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার রয়েছে এবং প্রশাসন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

মামুন