ফেনী মুক্ত দিবসের দিবাগত রাতে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হত্যাকাণ্ড ও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি কথা

লেখক, মোঃ মাসুম বিল্লাহ ভূঁইয়া.

১৯৭১ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের একেক জেলা একেকদিন স্বাধীন হয়, তেমনি ফেনী জেলা স্বাধীন হয় ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১।

ফেনী ছাগলনাইয়া উপজেলাধীন পাঠাননগর ইউনিয়নের পূর্ব সোনাপুর গ্রামে খোন্দকার বাড়ির অধিকাংশ মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার কারণে ৬ ডিসেম্বর ফেনী মুক্ত দিবসের একদিন পূর্বে ৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে সৈয়দুর রহমান খোন্দকারকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় রাজাকার আল বদরের সহযোগিতায় পাকিস্তানি বাহিনী। ঐসময় পরিবারের লোকজন জানতে পারেন, ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের দিবাগত রাতে তাকে হত্যা করা হয় ।

আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল বশর খন্দকারকে বাড়ি ধরে নিয়ে রাস্তায় মারধর করার একপর্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে খবর এলো ফেনী মুক্ত হয়ে যাচ্ছে, তাৎক্ষণিক পাকিস্তানি বাহিনী দ্রুত বেগে পালিয়ে যায়।

ফেনীর ছাগলনাইয়ার অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলে জানায়ায়, ফেনীকে পাক হানাদার মুক্ত করার জন্য ফেনীর অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়, এমনি এমনি ফেনীতে ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ হয় নাই।

মুক্তিযুদ্ধের সাব সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাফর ইমাম বীর বিক্রমের নেতৃত্বে ১৫ দিনের মত প্রচন্ড যুদ্ধের পর বিলোনীয়া সীমান্ত থেকে ছাগলনাইয়া, পরশুরাম, ফেনী, দাগনভূঁইয়া ও সোনাগাজী থানা শত্রুমুক্ত হয়। ৬ ডিসেম্বর ফেনী মুক্ত দিবস। বিশিষ্ট সাংবাদিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা খোন্দকার মোজাম্মেল হক ১৯৬৯ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে সকল কর্মসূচিতে সরাসরি সামনের সারিতে অংশগ্রহণ, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন অতঃপর ১৯৭১ সালের শুরুতে তিনি কেন্দ্র থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে ফেনী জেলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন ফেনীর অবিসংবাদিত জননেতা খাজা আহমেদ , বীর মুক্তিযোদ্ধা খোন্দকার মোজাম্মেল হকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদিন হাজারী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদীন ভিপি সহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা নেতৃবৃন্দ সমগ্র ফেনী জেলায় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পিছনে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সংগঠিত করেন। আর সামরিক বাহিনীর পক্ষে ফেনী জেলায় মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেন মুক্তিযুদ্ধের সাব সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাফর ইমাম বীর বিক্রম।

মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কেন্দ্রীয় সংগঠক, ফেনী জেলা স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সংগঠক হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রাখার কারণে ও খোন্দকার বাড়ির অধিকাংশ পরিবারের তথা খোন্দকার বাড়ির অধিকাংশ বীর মুক্তিযোদ্ধারা মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার কারণে হানাদার বাহিনীর আক্রোশ ছিল।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দুর রহমান খন্দকারের সন্তান জামাল উদ্দিন খন্দকার বলেন, রাজাকার এবং আলবদর বাহিনীর সহযোগিতায় পাকিস্তান বাহিনী আমাদের খোন্দকার বাড়িতে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের ধরতে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মেরে ফেলতে। কিন্তু সেদিন কাউকে পায় নাই, পেয়েছিলেন আমাদের পিতা শহীদ সৈয়দুর রহমান খোন্দকার ও আবুল বশর খোন্দকারকে।

৬ ডিসেম্বর১৯৭১ ফেনী মুক্ত হওয়ার পূর্বের দিন ৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ আমার পিতা শহীদ সৈয়দুর রহমান খোন্দকারকে রাজাকার ও আল বদরের সহযোগিতায় আমাদের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী ফেনীর ছাগলনাইয়া তৎকালীন পাকিস্তান বাজার ( বর্তমানে বাংলা বাজার) যেভাবে কোন মানুষ মারা গেলে কবর খনন করে মানুষকে মাটি প্রদান করে ঠিক একই কায়দায় মাটি খনন করে শহীদ সৈয়দুর রহমান খোন্দকারকে গর্তে ফেলে দিয়ে জীবন্ত মাটি চাপা দিয়ে পাকিস্তানি এবং রাজাকার বাহিনী হত্যা করে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা সন্তান জামাল উদ্দিন খন্দকার আরো বলেন, আমার আরেক কাকা আবুল বাশার খোন্দকারকে মারতে মারতে মাজা ভেঙ্গে দিয়ে তাকেও জীবন্ত মেরে ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক সে মুহূর্তে পাকিস্তানি এবং রাজাকার বাহিনী খবর পায় ফেনী স্বাধীন হয়ে গেছে, তখন আমার কাকা আবুল বাশার খোন্দকারকে মেরে আহত করে রাস্তায় ফেলে পাকিস্তান এবং রাজাকার বাহিনী পালিয়ে যায়।

ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা নুর আহমেদ বলেন, সেদিন আমাদের সাথে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করার কারণে বীর মুক্তিযোদ্ধা খোন্দকার মোজাম্মেল হক, বীর মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন খন্দকার, বীর মুক্তিযোদ্ধা এ বি এম এনামুল হক খোন্দকার , বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুল্লাহ খোন্দকার , বীর মুক্তিযোদ্ধার রফিক খন্দকার, বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মাওলা খন্দকার ও পাঠান নগরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মাস্টার আবুল হাশেম ভূঁইয়া মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করার কারণে বাড়িতে ছিলেন না, নতুবা সকল মুক্তিযোদ্ধাদের পাকিস্তানি বাহিনী হত্যা করতেন, কারণ ওই বাড়ি থেকে মুক্তিযুদ্ধের একজন কেন্দ্রীয় সংগঠক ছিলেন, এটা পাকিস্তানিরা কোনোভাবে মেনে নিতে পারেনি। সেদিন থেকে ফেনী স্বাধীন এবং মুক্ত হয় । পরে আবুল বাশার খন্দকারকে মানুষ উদ্ধার করে চিকিৎসা করায়, মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানিদের আক্রমণে আহত হয়ে শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন।
অর্থাৎ ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ফেনী মুক্ত দিবসের দিন খন্দকার বাড়ির ছিল হারানোর দিন, তারা হারিয়েছে শহীদ সৈয়দুর রহমান খন্দকারকে।

এ বিষয়ে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দুর রহমান খন্দকারের সন্তান জামাল খন্দকার বলেন, পাকিস্তানি হানাদার ও এই দেশি রাজাকারদের কারণে আমি কোন দিন বাবাকে বাবা বলে ডাকতে পারিনি। আমার বাবাকে জীবন্ত মাটি চাপা দেয় শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার কারণে । আমার জম্ম আর বাবার মৃত্যু এক‌ই দিন ।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নাতি মোহন বলেন, একটি জীবনে নানাকে দেখতে পারিনাই, আল্লাহ উনাকে বেহেস্ত নসিব করুক।