নির্বাচনে বিপুল ভোট পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। বিএনপির দেওয়া ইশতেহার জনমানুষের মধ্যে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এগুলো স্বল্প সময়ে পূরণ সম্ভব নয়। নতুন ক্ষমতাসীন দল ইশতেহারে ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার কথা বললেও নির্বাচনি ইশতেহার পূরণ করতে যে অর্থের প্রয়োজন হবে, তা জোগাড় করা বেশ কঠিন হবে।
এজন্য বাজেট ঘাটতিকে সীমিত রাখতে হবে। কাঠামোগত সংস্কারগুলোতে হাত দিতে হবে। ব্যাংকিং খাতের দুর্দশা কাটিয়ে উঠতে হবে। বিদ্যুৎ-জ্বালানির ভর্তুকি কাটাতে হবে। অর্থনীতিকে সাধারণ মানুষের জন্য সহনশীল করতে হবে। অর্থাৎ বিএনপির প্রতি জনমানুষের যে প্রত্যাশা, তার ব্যবস্থাপনাই হচ্ছে মূল চ্যালেঞ্জ। এজন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সরকারকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
নতুন সরকারের সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ আছে সেগুলো মোকাবিলায় বাংলাদেশ প্রতিদিনকে গতকাল এসব কথা বলেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিএনপি তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এগুলো একটা আকাশচুম্বী প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
স্বল্প সময়ের মধ্যে সব প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সম্ভব নয়। প্রতিশ্রুতি মূল্যায়ন করার যে কাজটা সবার সামনে আসবে সেটা হলো অর্থবছর ২০২৭-এর বাজেট। আর মাত্র দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে বাজেট চূড়ান্ত করতে হবে। নির্বাচনের প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে অনেকগুলো সরাসরি বাজেটে প্রভাব ফেলে। এর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলা হয়েছে। কৃষি ঋণ মওকুফের কথা বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। এগুলো সব পূরণ করতে হলে যে অর্থের প্রয়োজন হবে তা জোগাড় করা বেশ কঠিন। কারণ বিএনপির ইশতেহারে এটিও বলা হয়েছে তারা ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। এর অর্থ বাজেট ঘাটতিকে সীমিত রাখতে হবে। এজন্য ব্যয়বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে যদি রাজস্ব আয় বৃদ্ধি সম্ভব হয়। না হলে বাজেট ঘাটতি বেড়ে যাবে। এখানে অঙ্ক মেলানো চ্যালেঞ্জের। আয়, ব্যয় এবং ঘাটতির সঙ্গে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির সমন্বয় করার অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। এজন্য প্রত্যাশার ব্যবস্থাপনাই হচ্ছে এখনকার চ্যালেঞ্জ।
তিনি আরও বলেন, সরকার পাঁচ বছর মেয়াদের ইশতেহার দিয়েছে। এজন্য আগে থেকে এটি পরিষ্কার করতে হবে যে, এই প্রত্যাশা এক বছরেই পূরণ করা সম্ভব নয়। সরকারকে চেষ্টা করতে হবে মানুষের প্রত্যাশাকে একেবারে মেরে না ফেলা। একই সময়ে আকাশচুম্বী প্রত্যাশাকে মাটিতে নামিয়ে আনার একটি পথ সরকারকে বের করতে হবে। বাজেটের সঙ্গে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি না হলে পরের বছরও সরকার তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারবে না।
রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির টেকসই উপায় হলো অর্থনীতির আকার বাড়ানো। কর্মকান্ডে চাঞ্চল্য আনা। এতে ট্যাক্স আদায়ের পরিমাণ বাড়বে। এটি করতে হলে কাঠামোগত সংস্কারগুলোতে হাত দিতে হবে। বিশেষ করে যেখানে বিষফোড়াগুলো বেশি পীড়া দিচ্ছে। এর মধ্যে ব্যাংকিং খাতে, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে, বিজনেস রেগুলেশনের ক্ষেত্রে ট্রেড লজিস্টিকসহ আরও বেশ কিছু খাত আছে।
ব্যাংকিংয়ের দুর্দশা কাটিয়ে উঠতে হবে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের এখন ৫০ হাজার কোটি টাকার ওপর লোকসান, যা অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এটি কমাতে হলে বিদ্যুতের দামও বৃদ্ধি করতে হবে। দাম বাড়লে জনজীবনে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। এমনিতেই মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে আছে, মানুষ একে ভালোভাবে গ্রহণ করবে না। দাম কমানোর ক্ষেত্রে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যে চুক্তি আছে সেগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা যেতে পারে। কাঠামোগত সংস্কারের ক্ষেত্রে কী এবং কেন করতে হবে এগুলো গত দেড় বছরে বেশ ভালোভাবেই চিহ্নিত হয়েছে।
এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনেক প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে। বিদ্যুৎ, ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন খাতের জন্য বিশেষায়িত এসব প্রতিবেদন সে সময় প্রকাশ পেয়েছে। এজন্য নতুন করে কিছু করার নেই। বিএনপি ইশতেহারে বলেছে, তারা একটা ইকোনমিক রিফর্ম কমিশন করবে কাঠামোগত সংস্কারের জন্য। এখন এই রিফর্ম কমিশনকে যদি আবার একটি অর্থনীতির কোথায় ও কী সমস্যা আছে তা জানতে ডায়াগনসিস করতে বলা হয় তাহলে সময় অপচয় হবে।
রিফর্ম কমিশন যদি সরকার করে তাহলে তাদের ম্যান্ডেট দেওয়া উচিত যে কাজগুলো হয়েছে সেখানে কী এবং কেন করতে হবে তা আগের প্রতিবেদন দেখে অগ্রাধিকারের তালিকা করতে পারে। সেখান থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কোন কাজ আগে করতে হবে তার স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি খাতওয়ারি পরিকল্পনা করতে হবে। এরপর কোন সিদ্ধান্তগুলো আগামী বাজেটের আগে ও পরে নিতে হবে তা ঠিক করতে হবে।
যে সিদ্ধান্তগুলো সরকার নিচ্ছে তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নজরদারি করতে হবে। এখানে একটি স্বাধীন বা তৃতীয় চোখ থাকা দরকার। এটি রিফর্ম কমিশনের মাধ্যমে করা যেতে পারে। এতে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে তা কোথায় এবং কেন আটকে আছে সে বিষয়ে স্বাধীন মতামত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জানিয়ে দিতে পারবে। একে একটি টাস্কফোর্স হিসেবে গঠন করতে হবে।
পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নতুন সরকারে যারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন এদের অধিকাংশই অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। আমাদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা প্রত্যাশাগুলোর বাস্তবায়ন তারা করবেন বলে আশাবাদী। অর্থ, বাণিজ্য ও শ্রম মন্ত্রণালয় এই তিন মন্ত্রণালয় ঘিরেই ব্যবসায়ীদের আগ্রহ।
সরকারের এই তিন মন্ত্রণালয়ে যারা দায়িত্বে আছেন আমাদের বিশ্বাস তারা সফলভাবে তা পরিচালনা করবেন। আমরা যারা মূল স্টেকহোল্ডার তাদের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার আলোচনার প্রয়োজন মনে করেনি। বিএনপি সরকার এমন করবে না বলে আশা করছি।
আমাদের সঙ্গে সময়ে সময়ে আলোচনা করে এ ব্যাপারে যখন যা প্রয়োজন সেই পদক্ষেপ নেবেন বলে প্রত্যাশা করছি। অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেনি বলেই বর্তমানে দেশের অর্থনীতি স্থবির অবস্থায় আছে। এখানে বিনিয়োগও নেই। একটার পর একটা গার্মেন্ট বন্ধ হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভুলনীতির কারণে ব্যবসায়ীরা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। অতীতে বিএনপি সরকারের সময় পোশাক খাত খুব দ্রুত উন্নতি করেছিল, আশা করছি বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ও সে ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নতুন সরকারকে প্রথমেই দেশে আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত অর্থনীতিকে সাধারণ মানুষের জন্য সহনশীল করতে হবে। অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। এ সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম যারা ২০২৪ সালে রাস্তায় নেমেছিল তারা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা হিসেবে নেমেছিল। তারা নিজের চাকরি ও জীবনজীবিকা নিয়েই নেমেছিল।
দেশে প্রতি বছর ২০ লাখ তরুণ-তরুণী কর্মসংস্থানের বাজারে নামছে। ফলে কর্মসংস্থান তৈরি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ তরুণদের মধ্যে এখনো এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছে। তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। এজন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত ও ন্যায্যতা বজায় রাখতে হবে। ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা তৈরির করা জুলাই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল। এসব ব্যাপারে সরকারকে নীতিগতভাবে মনোযোগ দিতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা আসতে হবে।
বিএনপি যদি দীর্ঘমেয়াদি রাজনীতি করতে চায় তাহলে নতুন ধরনের গঠনমূলক রাজনীতি প্রক্রিয়ায় তাদের যেতে হবে। এজন্য সবার সঙ্গে আলোচনা করে একটি কমন ন্যাশনাল এজেন্ডা ধরে শান্তিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নে যেতে হবে। প্রতিপক্ষকে ঠেকানোর রাজনৈতিক সংস্কৃৃতি থেকে বের হতে হবে। এ ছাড়া ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে। তিন বছরে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাব আমরা। তখন পুরো পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিন্যস্ত হবে। এজন্য তখন দেশে অভ্যন্তরীণভাবে সংস্কার করতে হবে। এজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় সহযোগিতা লাগবে।
-সাইমুন










