জোহা স্যারের অনুপ্রেরণার গল্প ‘ভয় করি না মরণে’

ছবিঃ সংগৃহীত

জুলাইয়ের উত্তাল সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী অঞ্চলের ছাত্র-জনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্লোগান ছিল, ‘জোহা স্যারের স্মরণে, ভয় করি না মরণে’। এটি শুধু একটি স্লোগান নয়, ছিল এক অনুপ্রেরণার গল্প। ৬৯’র ১৮ ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষার্থীদের দিকে তাক করা পাকিস্তানি বাহিনীর বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ছাত্রদের গায়ে গুলি লাগার আগে, সেই গুলি আমার বুকে লাগবে।’ তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে ড. শামসুজ্জোহার চর্চা সেভাবে হয়নি। ফুটে ওঠেনি স্বাধিকার আন্দোলনের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবীর গল্প।

১৯৬৯ সালে পাকিস্তানি সরকারের করা ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার’ বিরুদ্ধে বাংলার ছাত্র-জনতা দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। ঊনসত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে বাঙালি আত্মদানে নিজেদের উৎসর্গ করার দীক্ষা নিচ্ছিল। এর মাঝেই ২০ জানুয়ারি পাকিস্তানি পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, যিনি শহীদ আসাদ নামে পরিচিত। এরপর ফেব্রুয়ারি মাসের ১৫ তারিখ ঢাকা সেনানিবাসে হত্যা করা হয় সার্জেন্ট জহুরুল হককে।

আসাদ ও জহুরুল হত্যায় দেশের মানুষের মধ্যে আন্দোলনের আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। সার্জেন্ট জহুরুল হককে হত্যার প্রতিবাদে ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহস্র ছাত্র-ছাত্রী আন্দোলনের প্রস্তুতি নেয়। ফলে পরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন নাটোর রোডে স্থানীয় প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। তবে উত্তেজিত ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভাঙার প্রস্তুতি নেন। এতে সশস্ত্র বাহিনীও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটাকে প্রস্তুতি নিয়ে সর্বাত্মকভাবে।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা দমে না গিয়ে প্রধান ফটকের প্রাচীর টপকে বের হয়ে পড়েন। সে পরিস্থিতিতে স্বাধীনতাকামী ছাত্রদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনী রাইফেল উঁচিয়ে প্রস্তুতি নিতে থাকে। এতে ছাত্ররাও তাদের গাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেন।

ড. জোহা তখন ছিলেন রসায়ন বিভাগের লিডার (সহযোগী অধ্যাপক) ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রক্টর। উত্তেজনাকর এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন হাদির সঙ্গে কথা বলার জন্য জোহা এগিয়ে যান। তাকে অনুরোধ করেন যেন সেনাদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের মারাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া না হয়। মেইন গেট-সংলগ্ন নাটোর রোডে ছাত্রদের ঢল নামতে শুরু করলে পাকিস্তানি মিলিটারি বাহিনী ছাত্রদের ওপর গুলি করতে উদ্যত হয়। তখন জোহা হাত উঁচু করে মিলিটারিদের উদ্দেশে বলতে থাকেন, ‘প্লিজ, ডোন্ট ফায়ার! আমার ছাত্ররা এখান থেকে এখনই চলে যাবে…!’

এতেও থামে না পাক সেনারা। তখন তিনি সামনে দাড়িয়ে উচ্চকন্ঠে বলেন, ‘ছাত্রদের গায়ে গুলি লাগার আগে সেই গুলি আমার বুকে লাগবে।’ এক পর্যায়ে বর্বর পাকিস্তানি সেনারা তাকে গুলি করে। ড. শামসুজ্জোহাকে গুলি করেই ক্ষান্ত হয়নি পাকি বাহিনী, মতিহারের মাটিকে রক্তরঞ্জিত করে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় এই মহান শিক্ষককে। এতে গুরুতর জখম হন তিনি।

আহত এই শিক্ষককে নিজেদের গাড়িতে করে তুলে নিয়ে যায় সেনারা। পরে নগরীর সোনাদীঘির মোড়ে আবারও শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে পড়ে তারা। সেখানে আরও এক দফা স্থানীয় শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালায় সেনারা। পরে তারা আহত জোহাকে বিকেলের দিকে চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠান। সেখানে তিনি অস্ত্রোপচার চলাকালীন শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

ড. শামসুজ্জোহা স্বাধীকার আন্দোলনের শহীদ বুদ্ধিজীবীর তালিকায় প্রথম নাম লেখান। ড. শামসুজ্জোহা হয়ে ওঠেন লড়াই সংগ্রামের অনন্য প্রতীক। সবশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে রাজশাহী অঞ্চলের লড়াইয়ের অন্যতম প্রতীক ছিলেন তিনি। একাধিক স্লোগান তৈরি হয়েছিলো তাকে ঘিরেই। একটি স্লোগান ছিলো, ‘জোহা স্যারের স্মরণে, ভয় করি না মরণে।’ শুধু রাজশাহী নয়, তার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, জুলাই আন্দোলনের প্রথম আত্মদানকারী বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাইদও। ১৫ জুলাইয়ে তার এক ফেসবুক পোস্টে আবু সাইদ লিখেন, ‘স্যার! এ মুহূর্তে আপনাকে ভীষণ দরকার স্যার।’

শহীদ জোহার এই আত্মদানের বিষয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে তেমন স্বীকৃতি আসেনি। তবে ২০০৮ সালে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এ. এইচ. এম. জেহাদুল করিম লিখেন, ১৯৬৯-এর পর ২০০৮ সালে আমি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে কর্মরত অবস্থায় ড. জোহাকে মরণোত্তর একুশে পদকের জন্য সুপারিশ করি এবং অতি বিনয়ের সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি, আমিই সেখানে ড. জোহার নাম রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একুশে পদকের জন্য প্রস্তাব করি।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তৎকালীন সম্মানিত চেয়ারম্যান প্রফেসর নজরুল ইসলাম এতে আমাদের খুব সহযোগিতা করেন। তার কাছে এই ক্ষেত্রে আমাদের কৃতজ্ঞতা অনেক। কেননা, তিনিই ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আমার উত্থাপিত এই প্রস্তাবটি কার্যে পরিণত করতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেন। যার ফলশ্রুতিতে ড. জোহাকে ২০০৮ সালে মরণোত্তর একুশে পদক দেওয়া হয়।  এদিকে এই দিনটিকে জাতীয়ভাবে উদযাপনের জন্য দিনটিকে শিক্ষক দিবস হিসেবে স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে আসছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘদিনের এই দাবি মেনে নেওয়ার কোনো পদক্ষেপই দেখা যায়নি।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মোজাম্মেল হোসেন বকুল  বলেন, ‘আমরা শামসুজ্জোহা স্যারের অবদান দুটো দিক থেকে দেখতে পারি। প্রথমত, তিনি শিক্ষার্র্থীদের বাঁচাতে সামনে এগিয়ে আসলেন, আবার তাকে যখন আহত অবস্থায় গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন আবার শিক্ষার্থীরা তাকে বাঁচাতে জীবন দিয়েছেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কে এমন উদাহরণ ইতিহাসে বিরল ঘটনা। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের এক দারুণ অনুপ্রেরণা হতে পারেন তিনি। অন্যদিকে, তার আত্মদানের পরেই তৎকালীন চলমান আন্দোলনে ব্যাপক গতি পায়। এতে বঙ্গবন্ধুর ফাঁসির আদেশ স্থগিত হয়। ঐতিহাসিকভাবে আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।’

তিনি আরও বলেন, তার এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের একটিও রাষ্ট্রীয়ভাবে মুল্যায়িত হয়নি। গত ৫ দশকের অধিক সময়জুড়ে ১৮ ফেব্রুয়ারিকে শিক্ষক দিবস ঘোষণার দাবি জানানো হয়েছে। কিন্তু সে দাবির কোনো আমলে নেওয়া হয়নি। আমরা দিবসটির স্বীকৃতি চাই এবং দেশের সমস্ত পর্যায়ে তার জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের চর্চার চালু হোক।

-বেলাল