পরাজিত প্রার্থীরাও কি উচ্চকক্ষের সদস্য হতে পারবেন?  

ছবিঃ সংগৃহীত

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার পর এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে জাতীয় সংসদের ‘উচ্চকক্ষ’। কারা হচ্ছেন এই উচ্চকক্ষের সদস্য আর কী হবে তাদের যোগ্যতা-তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে ব্যাপক আলোচনা, সমালোচনা ও গুঞ্জন। এ নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে পরিষ্কার করে কিছু বলা নেই। দলগুলো যাদেরকেই মনোনয়ন দেবে তারাই হবেন জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষের সদস্য। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—নিম্নকক্ষের নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীরা সংসদের উচ্চকক্ষে সদস্য হতে পারবেন কি?

পরাজিত প্রার্থীদের সদস্য হওয়ার সুযোগ 

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সাধারণত উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের নির্বাচন একই সঙ্গে হওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে নিম্নকক্ষের নির্বাচন আগে হয়ে যাওয়ায় একটি বিশেষ বিধান রাখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীরাও উচ্চকক্ষের সদস্য হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন, তবে এই সুযোগ থাকবে শুধু ত্রয়োদশ সংসদের জন্য।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি ড. আলী রীয়াজ বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে এবারের নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীদের উচ্চকক্ষের সদস্য পদে মনোনয়ন দিতে পারবে। এটি শুধু ত্রয়োদশ সংসদের জন্যই প্রযোজ্য হবে। পরবর্তীতে এ সুযোগ থাকবে না। কারণ, এবারের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে বিদ্যমান সংবিধান সংস্কারের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয়েছে। পরের অর্থাৎ চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন হবে সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী। সেখানে সংবিধান সংশোধন করা হলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংসদের উভয় কক্ষের (নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ) প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে একজন নেতা বা কর্মীকে সংসদের উভয় কক্ষের সদস্য পদে মনোনয়ন দেওয়ার সুযোগ থাকবে না বা দেবেও না।

তিনি জানান, বিদ্যমান সংবিধানে সংসদের উচ্চকক্ষের কোনও বিধান নাই। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হবে কিনা সেটিও নিশ্চিত ছিল না। সে-কারণে উচ্চকক্ষের সদস্য মনোনয়নের যে নির্দেশনা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে, তা এবারের জন্য প্রযোজ্য হবে না। এ কারণেই রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে এবারের সংসদ নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীদের সংসদের উচচ্চকক্ষে সদস্যপদে মনোনয়ন দিতে পারবে।

উচ্চকক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া ও কাঠামো 

উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি কী হবে, তা নির্ভর করবে সংশোধিত সংবিধান ও প্রণীত আইনের ওপর। সম্ভাব্যভাবে সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতে পারেন, আবার পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতিও থাকতে পারে যেখানে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ভোট দিয়ে সদস্য নির্বাচন করবেন। কিছু ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ, নারী বা সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে মনোনয়ন ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে। সদস্যদের মেয়াদ সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্ধারিত করা হবে এবং শপথ গ্রহণের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করবেন।

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) আদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী, উচ্চকক্ষের সদস্য সংখ্যা হবে ১০৫ সদস্যবিশিষ্ট। ১০০ জন সদস্য নির্বাচিত হবেন সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের আনুপাতিক হারে। বাকি ৫ জন সদস্যকে রাষ্ট্রপতি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী বা বিশেষজ্ঞদের মধ্য থেকে মনোনীত করবেন। এই পরিষদের প্রতিনিধিরা একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে। এর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। এর মেয়াদ হবে নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত।

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের ক্ষমতা 

উচ্চকক্ষ গঠিত হওয়ার পর বাংলাদেশের সংসদ কার্যত দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হয়ে যাবে। উচ্চকক্ষের প্রধান কাজ হবে আইন পর্যালোচনা ও পুনর্বিবেচনা করা। বিশেষ করে সাংবিধানিক ও গুরুত্বপূর্ণ আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের বিশেষ ক্ষমতা থাকবে। তবে এই কক্ষ সরকারের ওপর অনাস্থা আনতে পারবে না, যদিও তারা সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে।

এছাড়া উচ্চকক্ষের আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে প্রান্তিক কণ্ঠস্বর তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে। দুই কক্ষের মধ্যে কোনও মতবিরোধ দেখা দিলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের বিধান রাখা হয়েছে।

উল্লেখ্য, উচ্চকক্ষের পাশাপাশি নিম্নকক্ষ বা জাতীয় সংসদের আসন সংখ্যা হবে ৫০৫টি। এর মধ্যে ৪০০টি আসন হবে নিম্নকক্ষের। ৩০০টি আসনে প্রচলিত ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ (সরাসরি ভোট) পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে। বাকি ১০০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে, তবে তারা সারা দেশের নির্দিষ্ট ১০০টি নির্বাচনি এলাকা থেকে কেবল নারী প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন।

-বেলাল