নির্বাচন হয়েছে শান্তিপূর্ণভাবে : প্রয়োজন যুক্তিবুদ্ধির সংযোগ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। এতে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি। এখন এই শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের সঙ্গে যুক্তিবুদ্ধির সংযোগ দরকার। সেগুলোর খুব অভাব দেখি। রাজনৈতিক নেতারা তাঁদের মতো করে চলছেন, সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা কম। বলা যায়, আমরা একটি ঘুমন্ত জাতি। তিনি বলেন, জাতি গঠন, রাষ্ট্র গঠন এগুলোর জন্য যে নতুন চিন্তাধারা করার দরকার; সেসবের সূচনা হলেই কেবল আমরা আনন্দিত হব।

আমাদের দেশের রাজনীতি সাধারণভাবে নানা ভুলভ্রান্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই যুগে স্বাভাবিক রাজনীতির জন্য যে রাজনৈতিক নেতা দরকার, ব্যক্তি দরকার-এরকম কোনো নাম আমরা বলতে পারি না যে ইনি বাংলাদেশের নেতা, জনগণের নেতা। রাজনৈতিক দল বলে কিছু কিছু অর্গানাইজেশন আছে। এদের একটাকেও বলা যাবে না যে এরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের দল। এই দুর্বলতার মধ্যে নির্বাচন হয়েছে।

নির্বাচনে নানা দলের কথা উঠে আসছে কিন্তু বাস্তবে তো এই দলগুলো দল হয়ে ওঠেনি। আমি বলতে চাইছি, আমাদের রাজনৈতিক দলের যে মূল দুর্বলতা তার মধ্যে এই নির্বাচনটা হয়েছে। শেখ হাসিনা যেদিন পদচ্যুত হলেন সেদিন থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে বাংলাদেশ আর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অস্তিত্বশীল নেই। যেসব ঘটনা ঘটছে পর্দার অন্তরালে সেসবের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এগুলো হলো এই নির্বাচনের দুর্বলতার দিক। এসব দুর্বলতার মধ্যেও নির্বাচনটা হয়েছে শান্তিপূর্ণভাবে। ভিতরে যেসব ঘটনার কথা বললাম, এসব বাদ দিয়ে সাধারণভাবে যদি বলতে হয় তাহলে ১৯৭২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত যেসব জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তার মধ্যে এবারের নির্বাচন তুলনামূলক ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে। খুনাখুনি, মারামারি, হানাহানি, একদল অপর দলকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা এবং ঘৃণা ও বিদ্বেষপূর্ণ বক্তৃতা এগুলো এসব নির্বাচনে হয়নি। সেদিক থেকে বলব যে এটা একটা ভালো নির্বাচন হয়েছে।

এই নির্বাচনে জামায়াত সবচেয়ে আলোচিত। যাঁরা খবরের কাগজ নিয়মিত পড়েন, রাজনীতির খোঁজখবর রাখেন  তাঁরা বিষয়টি জানেন। যেকোনো চায়ের টেবিলে বসলেই জামায়াত নিয়ে আলোচনা হয়। এই যে এত আলোচনা জামায়াতকে নিয়ে, এতে মনে হয় দলটির আত্মবিকাশের অন্যতম একটি কারণ। নিজেরা নিজেদের রাজনৈতিক চেতনা, রাজনৈতিক ধারা, রাজনৈতিক স্বভাব উন্নত না করে কেবল জামায়াতের বিরোধিতা করেই কি আসলে রাজনীতির ভালো কোনো ধারা এখানে জন্ম নেবে?

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে জামায়াত কিন্তু তার আগের রাজনীতির ধারা পরিত্যাগ করেছে। মাওলানা মওদুদী ইসলামি রাষ্ট্র, খেলাফত প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজনীতি করেছিলেন। তখন জামায়াত খুব সুশৃঙ্খল ছিল। এবং ইসলামভিত্তিক চিন্তাভাবনা ছিল। কিন্তু সেই জামায়াত পরে ধীরে ধীরে শেষ হয়ে গিয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াত এখন আর কোনো ইসলামিক দল নয়। মুসলিম লীগ কি কোনো ইসলামি দল ছিল? মুসলমানদের দল ছিল। হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের সময় দলটি ছিল। লক্ষ্য করে দেখবেন, জামায়াত কয়েক বছর ধরে এসব কথা কখনো বলেনি যে তারা ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে, খেলাফত প্রতিষ্ঠা করবে এবং ইসলামই একমাত্র অবলম্বন। নামটা কেবল ‘ইসলামি’ বলে কিন্তু রাজনীতিতে ইসলামের কোনো কিছুই জামায়াত ধারণ করে না। এই যে জামায়াত বদলে গেছে-যাঁরা জামায়াত নিয়ে সব সময় আলোচনা করেন, তাঁরা কিন্তু এই বদলে যাওয়া বাস্তবতা বিবেচনা করেন না।

নির্বাচনে জেএনজি এবং নারী ভোটারদের ভূমিকা কেমন দেখলেন? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এবার একটা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছেন তাঁরা। নারী সম্পর্কে অতীতে জামায়াত নানা রকম কথা বলেছে। ইসলামে মেয়েদের অধিকার আছে, কিন্তু সবকিছুর অধিকার নাই, কোরআন-হাদিস অনুযায়ী নারীরা সবকিছু রাজনীতিতে করতে পারবেন না, এ ধরনের কথা আগে জামায়াত বলত। ১০-১২ বছর ধরে জামায়াত এ ধরনের একটা কথাও উচ্চারণ করেনি। জামায়াত যে রাজনীতিতে ইসলাম পরিত্যাগ করেছে এটা আমাদের ভাবতে হবে। দলটি যে একটা শৃঙ্খলা রক্ষা করে চলছে, দুর্নীতির অভিযোগে এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত হয়নি-এগুলো দেখতে হবে এবং বিবেচনা করতে হবে। জামায়াত যদি আগের চরিত্র এবং আগের আদর্শ নিয়েই থাকত, ধর্ম নিয়ে থাকত তাহলে এরকম হতে পারত না। জামায়াতের নেতারা এটা খুব ভালো করে বুঝেছেন যে এই যুগে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করা যাবে না।

বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশান্বিত হওয়ার খুব বেশি কারণ নেই। এই যুগে রাজনীতিকে যদি সুস্থতার দিকে নিতে হয় তাহলে অবশ্যই রাজনৈতিক দল লাগবে। দল হঠাৎ করে হয় না। দলের জন্য নেতৃত্বের প্রয়োজন হয়। নেতাদের সঙ্গে কর্মীদের ও জনসাধারণের সম্পৃক্ততা দরকার হয়। সেই অর্থে কোনো রাজনৈতিক দল এখন তো নেই। গঠনের কোনো চিন্তাও নাই। ১৫-২০ বছর আগে থেকেই এ ধরনের রাজনৈতিক দল আমাদের দেশে হচ্ছে না। একসময় এ ধরনের রাজনৈতিক দল গড়ে তোলার প্রত্যয় রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ছিল। এখন ওই নেতৃত্ব নিয়ে কোনো চিন্তাভাবনা নাই। কাজেই অনেক দিক দিয়ে আমাদের দেশের রাজনীতি শূন্যতার মধ্যে পড়ে গেছে। ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের দেশে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছে, এটা একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে আমাদের রাজনীতি। পর্দার অন্তরালে থেকে তারা কাজ করছে। আমাদের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা রক্ষা করার তাগিদও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দেখা যায় না। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও দেখা যায় না। এটা তো অত্যন্ত ক্ষতিকর একটা জাতির জন্য। জনসমষ্টির জন্য। এসব ক্ষতির মধ্যে আমরা আছি।

আমাদের দেশের খেটে খাওয়া মানুষ পরিশ্রম করছে। কাজ করছে। তাদের ওপর নির্ভর করে আমরা বাঁচতে পারছি। জনসাধারণ অনেক দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু অভাব হচ্ছে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি থাকত তাহলে অনেক কিছু অর্জন করা সম্ভব হতো।

শেখ হাসিনা যে উৎখাত হয়েছে, এজন্য বিএনপি বা জামায়াত কিন্তু দায়ী নয়। এসব দল শেখ হাসিনাকে উৎখাত করার কথাও ভাবেনি। আন্দোলনও করেনি। বিরোধী দল হিসেবে কেবল কিছু কথা বলেছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন হঠাৎ দেখা গেল। এসবের  পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নকশা কাজ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জিও পলিটিক্যাল কারণে বাংলাদেশ ও বঙ্গোপসাগরকে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। এজন্য বাংলাদেশকে তাদের গ্রিবের মধ্যে রাখতে চায়। বলা যায়, বাংলাদেশ তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিবের মধ্যে চলে গেছে। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে ভালো হয়েছে এটা তো আসলে বাইরে থেকে একটুখানি দেখা। সবটা দেখতে হলে একটু গভীরে গিয়ে ভাবতে হবে। সেটা দেখতে গেলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য কারা কী করছেন? রাজনীতিবিদরা কী করছেন? আর বুদ্ধিজীবীরা কী করছেন তা জানা যাবে। ভিতর থেকে দেখলে দেখা যাবে যে আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এগুলো চলে গেছে। সেদিক থেকে চিন্তা করলে এই নির্বাচন নিয়ে আমি উল্লসিত হওয়ার কিছু দেখি না।

-সাইমুন