বায়েজীদ মুন্সী : জুলাই অভ্যুত্থাণের পর স্বাস্থ্যখাতের আমূল পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল দেশের সব স্তরের মানুষের। জনপ্রত্যাশার প্রেক্ষিতে গঠন করা হয় সংস্কার কমিশনও। তারা ৯ মাস আগে প্রতিবেদন জমা দিলেও শুধুমাত্র বদলি ও পদোন্নতি ছাড়া কার্যকর কোন পদক্ষেপ নিতে পারেনি সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ। যেনতেন ভাবে রুটিন কাজে কেটে গেছে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ টি মাস। আর ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশ।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের কাছে যে প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে তারা কোনটি বাস্তবায়ন করেনি। অথচ তাদের অনেক কিছু করার ছিল। শুধুমাত্র একটি বিষয় হয়েছে সেটা হলো পদোন্নতি।
জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খানের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন ২০২৫ সালের ৫ মে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। জনমুখী ও কার্যকর স্বাস্থ্য খাত গড়ে তুলতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত সংস্কার কমিশন চার শতাধিক সুপারিশ করে। এরপর ১৩ আগস্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বৈঠক করে স্বল্প (ছয় মাস), মধ্য (১-২ বছর) ও দীর্ঘ মেয়াদে (২ বছরের বেশি) কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেয়। ৩৩টি সুপারিশকে স্বল্প মেয়াদে বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। ওই সময় যেসব সুপারিশ এখনই বাস্তবায়নযোগ্য, সেগুলোর জন্য দ্রুত উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসেও সেসবের কোনো বাস্তবায়ন হয়নি।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (ড্যাব) মহাসচিব ডা. জাহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের কাছে সবাই যার যার অবস্থান থেকে প্রস্তাবনা দিয়েছি। সত্যি বলতে তারা যে রিপোর্ট দিয়েছে কোনটি বাস্তবায়ন করেনি। তাদের অনেক কিছু করার ছিল। শুধুমাত্র একটি বিষয় হয়েছে সেটা হলো প্রমোশন। তিনি বলেন, আমরা বারবার বলি স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে, কিন্তু বাস্তবে অনেক মানুষ এখনো উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়েও সেবা পাচ্ছেন না। স্পষ্ট সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি আরও বলেন, ইউনিয়ন ও উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অধিকাংশই অকেজো। কোথাও লোকবল নেই, কোথাও যন্ত্রপাতি নেই। কোথাও আবার গাড়ি আছে টায়ার নেই, ড্রাইবার আছে তেল নাই এই অবস্থা বিরাজ করছে। তিনি ডায়াগনস্টিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক স্বাস্থ্য বীমা, পদোন্নতি কাঠামো এবং চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন। ডা. জাহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসকের ঘাটতি ও দুর্বল সেবা প্রাপ্যতা সংস্কার প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। জনগণ ও স্বাস্থ্য সেবা আজ মুখোমুখি। জনগণের দোড়গোড়ায় স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে যেতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, গত ১৭ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক কিছু করার ছিল। কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারিনি। এখন তাদের কিছুই করার নেই।
স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ডা. আকরাম হোসেন বলেন, উদ্যোগগুলো কার্যকর হলে সরকারি হাসপাতালের সেবার মান বৃদ্ধি পেতো, ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণ এবং প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসতো। কিন্তু এ সরকার সংস্কারের কোন ধার ধরে না। গণতান্ত্রিক সরকার হলে পদত্যাগ করতে বলতাম। এরা শুধু পদোন্নতি ছাড়া আর কিছু বোঝে না।
ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. এ কে এম ওয়ালিউল্লাহ বলেন, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কোন ব্যবস্থাই না। এটা এখন কাজা-কাফফারাসহ সংস্কার করা উচিত। স্বাস্থ্য খাতে কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য দলমত নির্বিশেষে সহযোগিতা ও আইনি সংস্কার প্রয়োজন। তিনি বলেন, আমরা কেউই কারো প্রতিপক্ষ নই। যে-ই ক্ষমতায় আসুক না কেন, পেশাজীবী হিসেবে আমাদের সবাইকে একে অপরকে সহায়তা ও গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাত সংস্কারে এগিয়ে আসতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফর বলেন, অধিকাংশ সুপারিশ বাস্তবায়নে আইন প্রণয়ন বা সংশোধন ও মন্ত্রণালয়ের নীতিগত নির্দেশনা দরকার। কিছু ক্ষেত্রে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত জরুরি। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এক অনুষ্ঠানে বলেন, দীর্ঘদিনের সমস্যা রাতারাতি সমাধান হবে না। জনবলসংকট নিরসনে ইতিমধ্যে কয়েক হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে কাজ করা হচ্ছে এবং আগামী দিনগুলোতে এর সুফল পাওয়া যাবে।










