নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে পারে দুটো দল

একান্ত সাক্ষাৎকারে ইসলামী আন্দোলনের যুগ্মমহাসচিব
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুটো দল প্রভাব বিস্তার করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত গাজীপুর-৫ আসনের প্রার্থী মাওলানা গাজী আতাউর রহমান। তিনি বলেন, নির্বাচন নিয়ে সবাই যার যার অবস্থান থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং করার চেষ্টা করবে এটাই স্বাভাবিক। তবে দুটো দল প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এক্ষেত্রে জামায়াতের চেয়েও বিএনপি বেশি প্রভাব বিস্তার করার সম্ভাবনা রয়েছে। মাওলানা গাজী আতাউর রহমান ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর যুগ্মমহাসচিব ও মুখপাত্র। তিনি হাতপাখা প্রতিক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচনী পরিবেশ, সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সরকার পরিচালনার বিষয়ে তিনি ‘আলোকিত স্বদেশ’ এর সঙ্গে একান্তে কথা বলেন। তার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আলোকিত স্বদেশ এর সিনিয়র রিপোর্টার বায়েজীদ মুন্সী।

আলোকিত স্বদেশ: নির্বাচনী প্রচারণার শেষ ভাগে এসে কেমন পরিবেশ দেখছেন?
গাজী আতাউর রহমান : এখন পর্যন্ত বড় কোন সমস্যা দেখছি না। তবে বিএনপির নেতাকর্মীরা আমার কর্মীদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। অপেক্ষা করি, দেখি সামনে কি পরিস্থিতি দাঁড়ায়।

আলোকিত স্বদেশ: বিভিন্ন স্থানে আপানাদের কর্মী ও সমর্থকদের উপর জামায়াতের হামলার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে সেটাকে কিভাবে দেখছেন?
গাজী আতাউর রহমান : আমার আসনে এখন পর্যন্ত জামায়াতের কেউ ভয়ভীতি কিংবা হামলা চালায়নি। তবে হ্যা, বেশ কয়েক জেলায় জামায়াতের লোকজন ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের উপর হামলা চালিয়েছে। নির্বাচনী পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তুলছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে এবং প্রশাসনের প্রতি আহবান করছে যেন, অবিলম্বে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হয়। কারণ এই ধরণের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড উৎসবমূখর নির্বাচনের পরিবেশকে কলুষিত করবে।

আলোকিত স্বদেশ: জামায়াত ইসলামের হঠাৎ করেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার বিষয়টি কীভাবে দেখছেন? সামনে দেশ তথা রাজনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ হবে কিনা?
গাজী আতাউর রহমান : জামায়াতের এ অবস্থার জন্য চেতনাধারীরাই দায়ী। তারা চেতনার অপব্যবহার করেছে। গত ৫৪ বছর দেশে শুধু সাইনবোর্ড বেচাকেনা চলেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর অপরাজনীতির ফলেই জামাতের উত্থান হয়েছে। সামনে দেশ তথা রাজনীতির জন্য ভালো কিছু মনে হয় না। কারণ তারা আদর্শিক শক্তি না।

আলোকিত স্বদেশ : নির্বাচন নিয়ে কোন শঙ্কা দেখছেন কিনা?
গাজী আতাউর রহমান : মানুষ নির্বাচন করতে বা ভোট দিতে আগ্রহী। কেউ যদি সেই আগ্রহে বাধা সৃষ্টি করতে চায়, করতে পারে। কিন্তু এতে ভোটার যারা রয়েছেন, তাদের কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। তাতে যে যাই করুক।

আলোকিত স্বদেশ: নির্বাচন কতটুকু স্বচ্ছ এবং গ্রহণযোগ্য হবে বলে মনে করেন?
গাজী আতাউর রহমান : আতীতের সব সরকারই শতভাগ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের অঙ্গিকার করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে কখনোই শতভাগ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এবারও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেওয়ার অঙ্গিকার করেছে সেটার দিকে তাকিয়ে আছি।

আলোকিত স্বদেশ: নানা মহল থেকে শোনা যায় ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হতে পারে? নির্বাচনী কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো কোনো দলের একচ্ছত্র আধিপত্যের কথা শোনা যায়। আপনারা কী মনে করেন?
গাজী আতাউর রহমান : ইলেকশন নিয়ে সবাই যার যার অবস্থান থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং করার চেষ্টা করবে এটাই স্বাভাবিক। তবে দুটো দল প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এক্ষেত্রে জামায়াতের চেয়েও বিএনপি বেশি প্রভাব বিস্তার করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সত্যিকার অর্থে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য ভোট হলে ইসলামী আন্দোলন ভালো করবে।

আলোকিত স্বদেশ: ভোটার কেন্দ্রমুখী করার ক্ষেত্রে আপনাদের কোনো পদক্ষেপ আছে কিনা?
গাজী আতাউর রহমান : আমার নির্বাচনী এলাকার ব্যবসায়ী, পেশাজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করছি এবং তাদের দীর্ঘদিনের নানাবিধ সমস্যা ও দাবিদাওয়া শুনছি। তাদের কাছে ভোট চাইছি। আমার মনে হয় ভোটাররা কেন্দ্রমুখী হয়েই আছেন। কারণ অনেক বছর তারা নিজেদেও ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি। যেহেতু এবার একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে ভোটাররা এ সুুযোগ হাতছাড়া করবেন বলে মনে হয় না। তারা ভোট ভোট দেওয়ার জন্যই প্রস্তুত রয়েছেন।

আলোকিত স্বদেশ: কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ ভোটে নেই। তাদের ভোটার বা সমর্থক কোন দিকে যেতে পারে বা তাদের বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
গাজী আতাউর রহমান : এটা অনেকটা ব্যক্তি সম্পর্কের উপর নির্ভর করবে। পাশাপাশি ভোটাররা যাদের নিরাপদ মনে করবে তাদেরই ভোট দিবে। সেক্ষেত্রে আমরা যেহেতু দেশের মানুষের জন্য নিরাপদ তাহলে আমরা আশা করতেই পারি। তাছাড়া কোটি কোটি ভোটার পরিবর্তনের বিষয়টি মাথায় রাখবে বলে আমার বিশ^াস।

আলোকিত স্বদেশ: নির্বাচনে বিজয়ের বিষয়ে আপনি কতটুকু আশাবাদী?
গাজী আতাউর রহমান : বিজয়ী হওয়ার জন্য সবাই চেষ্টা করছে। কেউ কাউকে ছাড় দেবে না। আমরা আমাদের যতটুকু সাধ্য আছে চেষ্টা করে যাচ্ছি। ভোটারদের কাছে বার্তা পৌঁছে দিচ্ছি। ভালোই সাড়া মিলছে। আশা করি জনগণ শেষ পর্যন্ত আমাদের পাশে থাকবে এবং বিজয় হবে ইনশাআল্লাহ।

আলোকিত স্বদেশ: আপনারা সরকার গঠনের ব্যাপারে কতটুকু আশাবাদী?
গাজী আতাউর রহমান : ২৬৮ আসনে আমাদের প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। আমরা কোন আসনকে দুর্বল চোখে দেখছি না। সবগুলো আসনেই বিজয়ের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। আমরা পুরোপুরি আশাবাদী। এখন ভোটারদের মূল্যায়ন কি হয় সেটা দেখার বিষয়।

আলোকিত স্বদেশ: এলাকার গুরুত্বপূর্ণ কী কী সমস্যা জানেন?
গাজী আতাউর রহমান : আমার নির্বাচনী এলাকায় সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে মাদক। এখানে মাদকের ছড়াছড়ি। যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি জেলা শহরের সাথে ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই। অর্থাৎ পাবলিক বাস সার্ভিস নেই। এছাড়া কর্মসংস্থান সংকট, স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি, শিক্ষা ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা রয়েছে।

আলোকিত স্বদেশ: নির্বাচিত হলে আপনার নির্বাচনী এলাকা নিয়ে পরিকল্পনা কী?
গাজী আতাউর রহমান : জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হতে পারলে গাজীপুর-৫ আসনের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। বিশেষ করে মাদকে জর্জরিত এলাকাকে মাদকমুক্ত করবো ইনশাআল্লাহ। পাশাপাশি বর্তমানে ঢাকা ও গাজীপুর জেলা শহরের সাথে কালীগঞ্জ থেকে সরাসরি উন্নত যানবাহন ব্যবস্থা নেই। ঢাকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী এবং সাধারণ যাত্রীদের যাতায়াতে যে বিড়ম্বনা পোহাতে হয়, তা দূর করতে কালীগঞ্জ টু ঢাকা সরাসরি পাবলিক বাস সার্ভিস ও জেলা শহরের সাথে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করব। এছাড়া মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাই আমার রাজনীতির অন্যতম লক্ষ্য।

আলোকিত স্বদেশ: নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে যদি বিএনপির সরকার গঠনের সুযোগ পায়, তাহলে সরকারের কূটনৈতিক নীতি কী হওয়া উচিত। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে ভারতের সঙ্গে যে বৈরী সম্পর্ক রয়েছে সেটা কাটিয়ে ওঠা বা পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশের সঙ্গে কেমন নীতি অবলম্বন করা উচিত বলে মনে করেন?
গাজী আতাউর রহমান : আমরা নির্বাচনী ইশতেহারেই বলে দিয়েছি বাংলাদেশ তার সব প্রতিবেশী দেশ এবং বিশ্বের অপরাপর রাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলবে। ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রযুক্তি-জ্ঞান ও সংস্কৃতির আদান-প্রদানে বিশেষ গুরুত্ব দেবে। বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করে কোনো দেশের কোনো ক্ষতি হতে দেওয়া হবে না।

আলোকিত স্বদেশ: বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ, হঠাৎ করে উগ্রপন্থার (মব) উত্থানÑ এই বাস্তবতায় আগামী সরকার যারাই আসুক, কোনো চ্যালেঞ্জ দেখেন কিনা?
গাজী আতাউর রহমান : চ্যালেঞ্জ তো অবশ্যই আছে। কর্তৃত্ববাদ পরবর্তী সময়ে মবসহ আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অর্থনীতি বিধ্বস্ত। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, থানা, পুলিশ, সচিবালয়সহ কোথাও কোন চেইন অব কমান্ড নেই। এ অবস্থায় আইন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং একই সাথে দেশ শাসন ও রাজনীতির ক্ষেত্রে পুরনো সংস্কৃতির পরিবর্তন করে ভিন্নতাটা তুলে ধরে জনমনে আস্থা অর্জন করাই হবে নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

আলোকিত স্বদেশ: দীর্ঘক্ষণ সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
গাজী আতাউর রহমান : আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।####