পাকিস্তানের অস্থির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানে ধারাবাহিক বন্দুক ও বোমা হামলার পর শুরু হওয়া অভিযানে অন্তত ১৪৫ জন সশস্ত্র যোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। এসব হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ৩১ জন বেসামরিক নাগরিক।
রোববার দেওয়া সরকারি ঘোষণায় বলা হয়, শনিবার ভোরে প্রদেশটির বিভিন্ন এলাকায় একযোগে চালানো হামলার পর এই অভিযান শুরু হয়। নিহতদের মধ্যে পাঁচজন নারীসহ ৩১ জন বেসামরিক নাগরিক এবং ১৭ জন নিরাপত্তা সদস্য রয়েছেন।
নিষিদ্ধ ঘোষিত বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) এসব হামলার দায় স্বীকার করেছে। হামলার পর প্রাদেশিক সরকার বেলুচিস্তানজুড়ে কয়েক মাসের জন্য কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জারি করেছে। এর আওতায় জনসমাবেশ ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যান চলাচল সীমিত করা হয়েছে এবং জনসমক্ষে পরিচয় গোপন করতে পারে-এমন মুখঢাকা পোশাক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী সরফরাজ বুগতি কুয়েটায় সাংবাদিকদের বলেন, সেনা ও পুলিশ দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ‘ফিতনা আল-হিন্দুস্তান’ নামে পরিচিত ১৪৫ জন সশস্ত্র সদস্যকে হত্যা করেছে-যে পরিভাষাটি সরকার বিএলএর জন্য ব্যবহার করে থাকে। তিনি বলেন, গত দুই দিনে নিহত যোদ্ধার সংখ্যা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বুগতির দাবি, নিহতদের মরদেহ সরকারি হেফাজতে রয়েছে এবং তাদের মধ্যে কয়েকজন আফগান নাগরিক। তিনি আরও বলেন, “ভারত-সমর্থিত সন্ত্রাসীরা” জিম্মি করার পরিকল্পনা করেছিল, তবে তারা শহরের কেন্দ্রস্থলে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার ৯২ জন এবং তার আগের দিন ৪১ জন যোদ্ধা নিহত হয়। বুগতি জানান, হামলার বিষয়ে আগাম গোয়েন্দা তথ্য থাকায় একদিন আগে থেকেই পূর্ব-প্রস্তুতিমূলক অভিযান শুরু করা হয়েছিল।
তিনি আফগানিস্তানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ করে বলেন, বিএলএর শীর্ষ নেতারা আফগান ভূখণ্ড থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে ভারত ও আফগানিস্তান-উভয় দেশই এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক বিবৃতিতে বলেন, পাকিস্তানের এসব অভিযোগ “ভিত্তিহীন” এবং অভ্যন্তরীণ সমস্যার দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা মাত্র। তিনি ইসলামাবাদকে বেলুচিস্তানের জনগণের “দীর্ঘদিনের দাবিগুলোর” দিকে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
পাকিস্তানের সবচেয়ে দরিদ্র প্রদেশ বেলুচিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই সহিংসতা ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের কবলে। জাতিগত বেলুচ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ অধিক স্বায়ত্তশাসন এবং প্রদেশের প্রাকৃতিক সম্পদে বেশি অধিকার দাবি করে আসছে। বিএলএ নিয়মিতভাবে নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর পাশাপাশি বেসামরিক নাগরিকদের ওপরও আক্রমণ করেছে। প্রদেশটিতে কাজ করা চীনা নাগরিকরাও এসব হামলার লক্ষ্য হয়েছেন।
সরকারি কর্মকর্তারা জানান, সর্বশেষ হামলাগুলো কুয়েটা, গওয়াদার, মাসতুং ও নোশকি জেলায় প্রায় একই সময়ে চালানো হয়। হামলাকারীরা নিরাপত্তা স্থাপনায় গুলি চালায়, আত্মঘাতী হামলার চেষ্টা করে এবং কিছু এলাকায় অস্থায়ীভাবে সড়ক অবরোধ করে।
আল জাজিরার প্রতিবেদক কামাল হায়দার জানান, অন্তত ১২টি স্থানে হামলা চালানো হয়, যা তিনি একটি “দুঃসাহসিক অভিযান” হিসেবে বর্ণনা করেন। কুয়েটার বিভিন্ন এলাকায় পোড়া যানবাহন, গুলিবিদ্ধ ভবন এবং হলুদ টেপ দিয়ে ঘেরা সড়ক হামলার ভয়াবহতার সাক্ষ্য দিচ্ছে। সম্ভাব্য নতুন হামলার আশঙ্কায় বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে।
পাকিস্তানের প্রতিমন্ত্রী (স্বরাষ্ট্র) তালাল চৌধুরী বলেন, হামলাকারীরা বেসামরিক পোশাকে হাসপাতাল, স্কুল, ব্যাংক ও বাজারে প্রবেশ করে নির্বিচারে গুলি চালায় এবং বেসামরিকদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জানান, দুটি হামলায় নারী যোদ্ধাও অংশ নেয়। তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে এসব হামলায় সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী বেশি লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র এসব হামলার নিন্দা জানিয়ে পাকিস্তানের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে। দেশটি বিএলএকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
উল্লেখ্য, বেলুচিস্তানের বাইরে পাকিস্তান তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলারও মুখে পড়ছে পাকিস্তান।
সুত্রঃ আল জাজিরা
বেলাল হোসেন/










