গণতন্ত্রের ‘আপসহীন’ নক্ষত্রের বিদায়: বেগম খালেদা জিয়ার বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন

বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন উন্নয়নের একজন দূরদর্শী কারিগর। তাঁর দুই দশকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ পেয়েছে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিক্ষা বিপ্লব এবং অবকাঠামো উন্নয়নের নতুন মাত্রা। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং পুনরায় ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত তাঁর নেতৃত্বে দেশ অর্জন করেছে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।

খালেদা জিয়ার আগমনের সময় বাংলাদেশ ছিল ভারী বিদেশি ঋণের চাপে। তাঁর প্রথম মেয়াদে তিনি মুক্ত বাজার অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন করেন। ১৯৯১ সালে ভ্যালু এডেড ট্যাক্স (ভ্যাট) চালু করা, ১৯৯১ সালে ব্যাংক কোম্পানি অ্যাক্ট এবং ১৯৯৩ সালে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন গ্রহণ ছিল যুগান্তকারী পদক্ষেপ। একই সাথে ১৯৯৩ সালে ঢাকার কাছে নতুন রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) স্থাপন করা হয়। ফলে বাংলাদেশ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং জাপানের মতো দেশ থেকে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ আকর্ষণ। ​
খালেদা জিয়ার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল শিক্ষা খাতে। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের নারীদের প্রায় ৭০ শতাংশ ছিলেন নিরক্ষর। তাঁর সরকার প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে, দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সকল মেয়ের জন্য শিক্ষা বিনামূল্যে করে দেয়। ১৯৯৪ সালে চালু করা ‘মহিলা মাধ্যমিক বৃত্তি কর্মসূচি’ (ফিমেল সেকেন্ডারি স্কুল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম) গ্রামীণ মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ায় এবং শিশুবিবাহ হ্রাস করে। তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা খাত কর্মসূচি চালু করে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। এই কারণেই ফোর্বস ম্যাগাজিন ২০০৫ সালে তাঁকে বিশ্বের ২৯তম শক্তিশালী নারী হিসেবে স্থান দেয়।

শিক্ষার বাইরে খালেদা জিয়া নারী ক্ষমতায়নে বহুমুখী পদক্ষেপ নেন। তাঁর সরকার ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি চালু করে দরিদ্র নারীদের স্বনির্ভর করে তোলে। সরকারি চাকরিতে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা ৩০ থেকে বৃদ্ধি করে ৫০ করা হয়। তৃতীয় মেয়াদে তাঁর সরকার নারী ও শিশু বিরুদ্ধ সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করে এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে। পোশাক শিল্পে নারী কর্মীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় দুই লক্ষ এবং এই খাতে মোট কর্মসংস্থান বৃদ্ধি হয় ২৯ শতাংশ।

খালেদা জিয়ার সময়ের মহান অবকাঠামো প্রকল্পগুলো আজও বাংলাদেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। ১৯৯৪ সালে যমুনা বহুমুখী সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়, যা আজ দেশের পূর্ব-পশ্চিম সংযোগের প্রধান মাধ্যম। মেঘনা-গৌমতি সেতু নির্মাণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক উন্নয়ন, এবং চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ও রেলস্টেশন আধুনিকীকরণ ছিল উল্লেখযোগ্য প্রকল্প। একই সাথে উপকূলীয় সবুজ বেল্ট প্রকল্প শুরু হয়, যা পরবর্তীতে ঘূর্ণিঝড় দুর্যোগ মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

খালেদা জিয়ার সরকার বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি এবং মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনিজ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করে। চীন ও কোরিয়ার সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের জন্য। ভোলা এবং বঙ্গোপসাগরে নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয় তাঁর প্রথম মেয়াদে, যা দেশের শক্তি সুরক্ষা বৃদ্ধি করে।
খালেদা জিয়ার তৃতীয় মেয়াদে (২০০১-২০০৬) বাংলাদেশের বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ দ্বিগুণ হয়ে ২.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পায় ৪৮২ ডলারে এবং বিদেশি মুদ্রার সংরক্ষণ ১ বিলিয়ন থেকে ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। শিল্প খাতের অবদান জিডিপিতে ১৭ শতাংশ অতিক্রম করে এবং শিল্প বৃদ্ধির হার ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।

খালেদা জিয়ার সরকার দারিদ্র্য বিমোচন কৌশল কাগজ প্রণয়ন করে এবং ক্রমান্বয়ে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিতে বাজেট বৃদ্ধি করে। তাঁর তৃতীয় মেয়াদে দারিদ্র্য বিমোচনে বাজেট বরাদ্দ ৫৬ শতাংশে পৌঁছায়। উত্তর বাংলার ‘মোঙ্গা’ (অনাহার) সমস্যা মোকাবেলায় ৫০ কোটি টাকা তহবিল গঠন করা হয় এবং চরাঞ্চলে দুই বছরে ৫০০ কোটি টাকার জীবিকা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। ফলে তাঁর শাসনকালে দারিদ্র্যের হার প্রায় ৯ শতাংশ হ্রাস পায়।

১৯৯৩ সালে খালেদা জিয়া দক্ষিণ এশিয়ান আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) সভাপতিত্ব করে এই অঞ্চলে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরেন এবং ১৯৯২ সালে হোয়াইট হাউসে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসনে সম্মত করান। পানি বণ্টন নিয়ে জাতিসংঘে তাঁর কণ্ঠস্বর শোনা যায়।

খালেদা জিয়ার অবদান কেবল সংখ্যায় নয়, বরং জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে তার প্রভাবে প্রতিফলিত হয়। ২০০৬ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন তাঁর প্রশাসনের সাফল্যের উপর একটি বৃহত্তর প্রতিবেদন প্রকাশ করে, বিশেষ করে নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে তাঁর অবদান প্রশংসা করে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা এবং প্রকল্পগুলো আজও বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। একজন নারী নেতা হিসেবে তাঁর পথপ্রদর্শন বাংলাদেশের নারী শক্তিকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং দেশকে মধ্যম আয়ের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

অর্ণব চাকমা/