মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ: আহত স্ত্রী-সন্তানকে রেখে পলাতক পরিচালক, ‘উগ্রবাদী সন্দেহে’ আগেও গ্রেপ্তার

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদের যে মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ ঘটেছিল সেখান থেকে প্রচুর রাসায়নিক ও বিস্ফোরক উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে পুলিশ। যেসব রাসায়নিক উদ্ধার হয়েছে সেগুলো বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহৃত হয় বলে তাদের ভাষ্য।

এসব বিস্ফোরক বা রাসায়নিকের ‘অনিয়ন্ত্রিত’ বিক্রিয়ার কারণেই ওই মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ ঘটেছিল বলে প্রাথমিক ধারণার পুলিশের।

এ ঘটনার প্রধান সন্দেহভাজন মাদ্রাসাটির পরিচালক আল আমিন শেখ আহত স্ত্রী ও সন্তানকে রেখে পালিয়েছেন। আর পরিচালকের স্ত্রীসহ তিন নারীকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ।

পরিচালক আল আমিন কোনো উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কি না সে বিষয়ে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি।

পুলিশ বলছে, তার বিরুদ্ধে সাতটি মামলা রয়েছে এবং তিনি এর আগে দুইবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। এ মামলাগুলোর বিষয়ে যদিও বিস্তারিত তথ্য দেননি সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা।

তবে পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, ২০১৭ সালের ২৯ জুলাই ফতুল্লা থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের হওয়া একটি মামলায় এই আল আমিনকে আসামি করা হয়। তখন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ‘নব্য জেএমবি’ নামে একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য সন্দেহে।

কেরানীগঞ্জে শুক্রবার সকাল ১০টার পর এ বিস্ফোরণে উম্মাল কুরা ইন্টারন্যাশনাল নামে ওই মাদ্রাসার দুটো কক্ষের পাশের দেয়ালগুলো ধসে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

এতে মাদ্রাসার পরিচালক আল আমিন শেখ (৩২), তার স্ত্রী আছিয়া বেগম (২৮) এবং তাদের তিন সন্তানের মধ্যে দুই ছেলে উমায়ের (১০) ও আব্দুল্লাহ (৭) আহত হন। আহত স্ত্রী-সন্তানকে ফেলে রেখেই আল আমিন পালিয়ে গেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

আহতদের মধ্যে উমায়েরের শরীরে পোড়া ক্ষতের পাশাপাশি ভবন ধসের জখম চিহ্ন থাকার কথা বলেছে পুলিশ।

এ ঘটনায় পুলিশ আছিয়াসহ তিন নারীকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছে। গ্রেপ্তার অন্য দুজন হলেন আছিয়ার ভাই হারুনুর রশীদের স্ত্রী ইয়াসমিন আক্তার (৩০) ও আসমানী খাতুন ওরফে আসমা (৩৪)।

শনিবার হাসনাবাদের ওই মাদ্রাসায় গিয়ে জানা গেছে, শনিবার ঘটনাস্থলে গিয়ে মূলত আছিয়ার ভাই হারুনুর রশীদ ২০২২ সালে মাদ্রাসা করার কথা বলে একতলা ওই বাড়ি ভাড়া নেন। তিনি এখন দেশে নেই বলে পুলিশ তথ্য দিয়েছে। পরে মাদ্রাসাটি পরিচালনার দায়িত্ব পান আল আমিন। চার কক্ষের বাড়িটির দুটো কক্ষে মাদ্রাসার পাঠদান চলত, একটি কক্ষে পরিবার নিয়ে থাকতেন আল আমিন। আরেকটি কক্ষ বসার ঘর বা অফিস কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হত।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, বিস্ফোরণে চার কক্ষের দুটো পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ওই দুটো ঘরের শুধু ছাদটুকু অক্ষত আছে আর পাশের দেয়াল ধসে পড়েছে। অন্য দুটো কক্ষেও ভেঙে গেছে জানালার কাঁচ, জিনিসপত্র।

এদিন দুপুরের পর ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পরও সেই ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালাতে দেখা গেল সিআইডির ‘ক্রাইম সিন’ ইউনিটের ৮-১০ জন সদস্যকে। খোলা জায়গায় একপাশে রাখা ১৭-১৮টির মত কন্টেইনার, যেগুলো আলামতের তালিকায় রাসায়নিকের ড্রাম হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সারি করে রাখা নীল রঙের ১০টি ড্রামের গায়ে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড লেখা রয়েছে।

উদ্ধার করা আলামতের মধ্যে একজোড়া মরচে পড়া হাতকড়া, পুলিশ ব্যবহার করে এমন চওড়া বেল্ট ও একটি নাকল পাঞ্চ (ঘুষি মারার এক ধরনের অস্ত্র) দেখা গেল। বেশ কিছু জটলা বাঁধা তার, ইলেকট্রনিক্সসহ ছোট বোতলে আরও কিছু রাসায়নিকও ছিল জব্দ বস্তুর মধ্যে। এক বস্তা বইও উদ্ধার দেখানো হয়েছে সেখান থেকে।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তারা কেউ মুখ খুলতে চাইলেন না; তথ্যও দিলেন না। তারা থানায় যোগাযোগ করতে বললেন।

আশপাশে অনেক লোক ভিড় করে দাঁড়িয়ে ধ্বংসস্তূপে পুলিশের খোঁজাখুঁজি দেখছিলেন। তাদের কয়েকজন বললেন, উম্মাল কুরা নামের ওই মাদ্রাসায় শুধু ছোট শিশুদের ভর্তি নেওয়া হত। আরবি হরফ শেখানোর পাশাপাশি বাংলাও কিছু পড়ানো হত। মাদ্রাসার পরিচালক আল আমিনের পরিবারের সদস্যরাই পড়াতেন। বাইরের কোনো শিক্ষককে সেখানে আসতে দেখা যেত না।

ওই মাদ্রাসার ভবনের ভেতরে বিদ্যুতের কাজ করতে যেতেন ইলেকট্রিশিয়ান আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে তাকে ডেকে সিসি ক্যামেরার জন্য লাইন করে দিতে বলেছিলেন আল আমিন। তিনি গিয়ে লাইন করার পর তাকে জানানো হয়, ক্যামেরাটি তারা নিজেরাই স্থাপন করবেন।

পুলিশ ওই বাড়ি থেকে সিসি ক্যামেরার স্মৃতি সংরক্ষণ ডিভাইস বা ডিভিআর বক্সটি উদ্ধার করেছে।

বাড়ির মালিক পারভীন বেগম একটি অটোরিকশায় বসে কান্নাকাটি করছিলেন। তিনি বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর তার ভাই-বোনেরা মিলে তাকে ওই বাড়ি বানিয়ে দেয়। এই বাড়ি ভাড়া দিয়ে অন্য জায়গায় ভাড়া থাকেন তিনি। তিন বছর আগে বাড়িটি যেদিন মিলাদ পড়িয়ে উদ্বোধন করা হয় সেদিনই মুফতি হারুন পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি বাড়িটি মাদ্রাসার জন্য ভাড়া নিতে আসেন। কথা বার্তায় পছন্দ হওয়ায় পারভীন তাদেরকে ভাড়া দেন।

চারটি কক্ষের একতলা বাড়িটির ভাড়া হিসেবে আল আমিন মাসে ১০ হাজার টাকা দিতেন বলে জানান বাড়ির মালিক। অথচ আশপাশে পাকা বাড়ির একেকটি কক্ষের ভাড়া চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। এত কম টাকায় ভাড়া দেওয়ার বিষয়ে পারভীন বলেন, “এখানে লাইনের গ্যাস নাই। এইজন্যে কমেই দিছিলাম। তবে পরে যখন ভাড়া বাড়ানোর কথা বলছি তখন তারা বলে তাদের আয় নাই, তারা বেশি ভাড়া দিতে পারবে না।”

এসময় পাশ থেকে পারভীনের তরুণী কন্যা বলেন, “ওরা আমাদের ১০ হাজার টাকা দিতে পারে না কিন্তু ওদের বাড়ির মহিলারা সব গা ভরে ভরে স্বর্ণের অলঙ্কার পড়ে থাকত সবসময়।”

পুলিশের সংবাদ সম্মেলন

বিকালে ঘটনাস্থল থেকে কিলোমিটার খানেক দূরত্বে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মিজানুর রহমান।

তিনি বলেন, বিস্ফোরণের পর আহত স্ত্রী ও সন্তানদের হাসপাতালে রেখে নিরুদ্দেশ হয়েছেন প্রধান সন্দেহভাজন আল আমিন।

আল আমিনের বিরুদ্ধে ঢাকার আশপাশের জেলায় সাতটি মামলা থাকার তথ্য দিলেও মামলাগুলোর বিস্তারিত তিনি এখনও জানেন না বলে দাবি করেন এসপি।

তবে এর আগে আল আমিন দুইবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বলে তার স্ত্রীর বরাতে জানান তিনি। সর্বশেষ ২০২৩ সালে জামিনে বেরিয়ে প্রথমে অটোরিকশা চালাতেন, পরে তিনি রাইড শেয়ারিং করা শুরু করেন।

কেন বিস্ফোরণটা হল এমন প্রশ্নে এসপি বলেন, “ফায়ার সার্ভিস এ বিষয়ে এখনো মতামত দেয়নি। তবে যেহেতু সেখানে রাসায়নিকের ব্যাপক মজুত ছিল এবং আমরা সেখানে বিস্ফোরক জাতীয় বস্তু ককটেল পাওয়া গেছে। এখানে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট আছে, এটিইউ আছে তারা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে এখানে রাসায়নিকের বিক্রিয়া বা যে বিস্ফোরক দ্রব্য পাওয়া গেছে তার সিস্টেমের বিক্রিয়ার কারণে ওই বিস্ফোরণ ঘটেছে।”

নির্বাচনে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির জন্য এরকম করা হচ্ছে কী না জানতে চাইলে এসপি বলেন, “সবকিছুকে মাথায় রেখে আমরা কাজ করছি। অভিযান অব্যাহত আছে।”

আল আমিন উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এমন কথা শোনা গেছে। এ বিষয়ে এসপি বলেন, “তিনি জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন কি না বিষয়টা আমরা খোঁজ নিচ্ছি।”

ওখান থেকে কম্পিউটার, নতুন একটি ইয়ামাহা মোটরসাইকেল, রাসায়নিকসহ বিভিন্ন বস্তু উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার বস্তুর জব্দ তালিকা করার কাজ তখনো প্রক্রিয়াধীন বলে জানান এসপি।

হাইড্রোজেন পার অক্সাইড প্রসঙ্গ

শুক্রবার সকালে ঘটনার পরপর পুলিশের যে দলটি তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে গিয়েছিল তাদের বরাত দিয়ে এসপি মিজানুর রহমান বলেন, পুলিশের দলটি সেখানে গিয়ে ড্রামে ভরা প্রচুর রাসায়নিকের মজুদ দেখতে পায়। পরে ঘটনাস্থল তল্লাশি করে আরও কিছু বিস্ফোরকজাতীয় ককটেল সদৃশ বস্তু পাওয়া যায়। সেখানে বিস্ফোরক দ্রব্যের মজুদ নিশ্চিত হওয়ার পর পুলিশের সন্ত্রাসবাদ দমনের বিশেষায়িত ইউনিট এটিইউ, বোম ডিসপোজাল ইউনিট ও সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটকে খবর দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, সেখানে ৪০০ লিটারের মত বিভিন্ন টাইপের রাসায়নিক পাওয়া গেছে। কিছু কন্টেইনারে লেখা আছে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড।

একজন কর্মকর্তা জানান, নীলরঙের হাইড্রোজেন পার অক্সাইড স্টিকার আঁটা অনেকগুলো কন্টেইনার সিলগালা অবস্থায় ভর্তি পাওয়া গেছে। তাতে ধারণা করা যায় এগুলোতে হাইড্রোজেন পার অক্সাইডই রয়েছে। সাদা রঙের কতগুলো কন্টেইনার উদ্ধার হয়েছে, সেগুলোতে কী রয়েছে তা এখনো নিশ্চিত নয়। সেখানে বোমা তৈরির মতো আরও কিছু সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে, বলেন ওই কর্মকর্তা।

হাইড্রোজেন পার অক্সাইড ছাড়া সেখানে আর কী কী পাওয়া গেছে তা সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করেননি ঢাকার এসপি।

বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহৃত হয় বলে বিভিন্ন দেশে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড কেনাবেচার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বোম্ব মেকিং অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রামের (বিএমএপি) আওতায় হাইড্রোজেন পার অক্সাইড নিয়ে সাধারণ জনতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা চলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির একটি বুকলেটে বোমা (আইইডি) তৈরির জন্য বিস্ফোরক তৈরির উপাদান হিসেবে এ হাইড্রোজেন পার অক্সাইডকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

 

মাদ্রাসায় বিস্ফোরণে আহত ৪, বিস্ফোরক উদ্ধার